চাকরিজীবী ভাই-বোনদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ‘প্রভিডেন্ট ফান্ড’ বা ভবিষ্য তহবিল। কিন্তু আল্লাহর ভয়ে হারাম থেকে বাঁচতে চান এমন অনেকেই আমাদের কাছে একটি সাধারণ প্রশ্ন নিয়ে আসেন— “প্রভিডেন্ট ফান্ড কি হালাল? বিশেষ করে ফান্ডটি যদি ঐচ্ছিক হয়, তাহলে ইসলামের বিধান কী?”
একটি আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার কোম্পানির বাংলাদেশ শাখার কর্মকর্তারা ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই আমাদের কাছে এসেছিলেন। তাদের টিমের প্রভিডেন্ট ফান্ড ম্যানেজমেন্ট ও ইনভেস্টমেন্ট বিষয়ে আমাদের শারিয়াহ টিমের সাথে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তারা কোম্পানির প্রভিডেন্ট ফান্ড পলিসি তুলে ধরে এর শারিয়াহ বিধান জানতে চান। হালাল উপার্জনের প্রতি তাদের এই সচেতনতা দেখে আমরা যারপরনাই আনন্দিত হই।
সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি, প্রত্যেক চাকরিজীবীরই প্রভিডেন্ট ফান্ডের শারিয়াহ বিধান জেনে রাখা উচিত। প্রভিডেন্ট ফান্ড সাধারণত ২ ভাগে বিভক্ত: ১। বাধ্যতামূলক প্রভিডেন্ট ফান্ড (Compulsory Provident Fund) ২। ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (Voluntary/Recognized Provident Fund)
নিম্নে অত্যন্ত সহজভাবে এই দুই ফান্ডের বিধান আলোচনা করা হলো:
১. বাধ্যতামূলক প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিধান
সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত অথবা যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ডে অর্থ জমা রাখা বাধ্যতামূলক, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মীর বেতন থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্তন করা হয়। এক্ষেত্রে কর্মীর কোনো ধরনের স্বাধীন এখতিয়ার বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকে না। শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
- মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ: যেহেতু অর্থটি কর্মীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা বাধ্যতামূলকভাবে কেটে রাখা হচ্ছে, তাই এটি হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত তার পূর্ণ মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ সাব্যস্ত হয় না।
- অতিরিক্ত অর্থের প্রকৃতি: অবসরকালীন সময়ে মূল জমার অতিরিক্ত যে অর্থ প্রদান করা হয়, বিজ্ঞ মুফতিদের মতে তা মূলত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মীকে প্রদত্ত ‘বেতন-ভাতা’ বা ‘উপহার’ হিসেবে গণ্য।
- সুদ না হওয়ার কারণ: প্রচলিত ব্যবস্থায় এই অতিরিক্ত অংশকে ‘সুদ’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও শরিয়াহ অনুযায়ী তা সুদ নয়। কারণ, সুদ হওয়ার জন্য দ্বিপাক্ষিক ও স্বতন্ত্র চুক্তি হওয়া আবশ্যক (যেখানে এক পক্ষ মুনাফার শর্তে অর্থ প্রদান করে)। বাধ্যতামূলক ফান্ডে এ ধরনের কোনো স্বতন্ত্র চুক্তি সম্পাদিত হয় না।
২. ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিধান
বেসরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেখানে প্রভিডেন্ট ফান্ডে অংশগ্রহণ ঐচ্ছিক (Optional), সেখানে বিনিয়োগ ও মুনাফার বিধান বাধ্যতামূলক ফান্ডের চেয়ে ভিন্ন। এর থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত টাকা হালাল হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। কিছু মৌলিক কথা নিম্ন তুলে ধরা হলো।
ক. চাকরিজীবীর (Employee) দৃষ্টিকোণ
যেহেতু এখানে চাকরিজীবী নিজস্ব পছন্দে অর্থ জমা রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাই এটি একটি স্বেচ্ছায় সম্পাদিত চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
হালাল হওয়ার শর্ত: যদি ফান্ডের অর্থ শরিয়াহ-সম্মত কোনো ব্যবসা বা হালাল খাতে বিনিয়োগ করা হয়, তবে সেখান থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ।
হারাম হওয়ার প্রেক্ষিত: যদি উক্ত ফান্ডের অর্থ প্রচলিত সুদী ব্যাংকে বা শরিয়াহ পরিপন্থী কোনো কারবারে বিনিয়োগ করা হয়, তবে তার বিপরীতে প্রাপ্ত অতিরিক্ত অর্থ সুদ হিসেবে গণ্য হবে এবং তা গ্রহণ করা বৈধ হবে না।
খ. নিয়োগকর্তার (Employer) দৃষ্টিকোণ
প্রতিষ্ঠানের মালিক বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব হলো কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও শরিয়াহ-সম্মত বিনিয়োগ ব্যবস্থার সংস্থান করা।
প্রভিডেন্ট ফান্ড ব্যবস্থাপনায় শরিয়াহ নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা এবং একটি স্বচ্ছ ‘হালাল পলিসি’ প্রণয়ন করা নিয়োগকর্তার জন্য অপরিহার্য।