সুদ নিষিদ্ধের কারণ : অর্থনীতি ও বাস্তবের আলোকে

মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম

সিএসএএ, এ্যাওফি, বাহরাইন

ড. মুহাম্মাদ কবির হাসান

প্রফেসর, ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্স, যুক্তরাষ্ট্র।

 

সুদ একটি অনুৎপাদনশীল খাত। এটি এক দিকে সবসময় পজিটিভ সাইন বহন করে। কিন্তু অন্য দিকে নেগেটিভও হতে পারে। এভাবে এটি অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। হয়তো ব্যক্তিবিশেষের সুদ পরিশোধে সমস্যা হয় না। কিন্তু পণ্যমূল্য ধার্যকরণ, বেতন নির্ধারণ ইত্যাদি অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ছড়ায়। সামগ্রিকভাবে এটি অর্থনীতির জন্য কল্যাণকর নয়।

অর্থনৈতিক কল্যাণ বলতে কী বোঝায়?
একটি দেশের শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি হওয়া, রফতানি অধিক হওয়াটাই সার্বিক অর্থনৈতিক কল্যাণ নয়। বরং মূল হলো সম্পদ বণ্টনের ব্যবস্থা সুষম ও ভারসাম্য থাকা। প্রত্যেক শ্রেণীর মানুষের তার মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারা। ধনী-গরিবের মাঝে অস্বাভাবিক ক্ষতিকর ব্যবধান না থাকা। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় ইত্যাদি বলা হয়। তবে গণমানুষ কতটুকু উপকৃত হচ্ছেন- সেটি এসব তথ্যে ফুটে উঠে না।

ওয়ার্ল্ড ইনইক্যুয়ালিটি রিপোর্ট-২০২২-এ সত্যটিই উঠে এসেছে- Economic growth numbers are published every year by governments across the globe, but they do not tell us about how growth is distributed across the population – about who gains and who loses from economic policies.

বাস্তবতা হলো- সম্পদের গণমুখী ভারসাম্য বণ্টন আমরা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছি পদে পদে। এ ব্যর্থতার পেছনে অনেক কিছুই দায়ী। অর্থনৈতিক দিক থেকে এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রচলিত সুদ। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের অর্থনীতি সুদভিত্তিক ধারায় পরিচালিত। প্রতি বছর বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধের জন্যই ১১-১২ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হয়। এটি আমাদের বাজেটে চতুর্থ শীর্ষ ব্যয় খাত! সুদ আমাদের অর্থনীতিকে কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে- নিচে সংক্ষেপে কিছুটা আলোকপাত করা হলো-

১. প্রান্তিক মুদ্রানীতি
হিজরি প্রথম সনের একজন বিখ্যাত ফকিহ, তাবেয়ি ও স্কলার হাসান বসরী রহ:। বিশিষ্ট তাবেয়ি কাতাদাহ রহ: তার ব্যাপারে বলেছেন, ‘হালাল-হারাম ও অর্থনীতি বিষয়ে হাসান বসরী রহ: ছিলেন লোকদের মাঝে অধিক জ্ঞানী’। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৪৫৬)

হাসান বসরী রহ: মুদ্রার ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন-
Money is such a companion of yours that is does not benefit you, unless leave you. (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৪৫৫)

ওই মন্তব্যটি যদিও খুবই সংক্ষিপ্ত, তবে গভীর অর্থবহ। এতে দু’টি কথা বলা হয়েছে। যথা-
ক. লেনদেনে মুদ্রার আপন সত্তা উদ্দেশ্য নয়; বরং তা অন্য উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
খ. মুদ্রার আপন সত্তায় কোনো উপকার (Intrinsic usufruct or value) নিহিত নেই। এটি মানুষের তখনই উপকারে আসে, যখন তা নিজ থেকে পৃথক করে এর বিনিময়ে উপকারী কিছু ক্রয় করা হয়।
সহজ কথায়, মুদ্রা কেবল বিনিময়ের মাধ্যম ও বস্তুর মূল্য পরিমাপক। মুদ্রার অন্তর্নিহিত সৃষ্টি-উদ্দেশ্য এটিই। মুদ্রা নিজেই দ্রব্য বা বিনিময়যোগ্য নয়।

 

বারোতম খ্রি. শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, ফকিহ ও অর্থনীতিবিদ হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মাদ গাজালি রহ: মুদ্রার ওই দৃষ্টিভঙ্গিকে বিশদভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন-
‘মুদ্রা সৃষ্টি আমাদের প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। তিনি একে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার আপন সত্তায় সরাসরি কোনো উপকার রাখা হয়নি। বরং এটি অন্য সব দ্রব্যের বিনিময় মাধ্যম ও মূল্য নির্ধারক।

দ্রব্যের মতো একে সরাসরি লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বানানো হয়নি। যেন সবার কাছেই এর প্রয়োজন সমান গুরুত্বের সাথে বিদ্যমান থাকে। যদি দ্রব্যের মতো মুদ্রার আপন সত্তা সরাসরি ভোগ-বস্তু হতো, তা হলে এমন হতো, কারো কাছে কোনো একসময় এটি ভোগ-বস্তু, কারো কাছে নয়। যেমনটি দ্রব্যের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এতে মুদ্রা সৃষ্টির উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো।

 

বরং একে সৃষ্টি করা হয়েছে এমনভাবে যে, এটি অন্য সব দ্রব্যের বিনিময় মাধ্যম। এর অর্থ মুদ্রা কারো কাছে থাকার অর্থ, তার কাছে সব কিছুই থাকা। সে চাইলে যখন তখন তার ইচ্ছা পূরণ করতে পারবে। পক্ষান্তরে, দ্রব্যের মধ্যে এমনটি ঘটে না। (ইয়াহইয়া উলুমুদ্দিন, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৪৮)

অর্থনীতিবিদ ও মুফতি তাকী উসমানী মন্তব্য করেছেন, অর্থনীতিতে মুদ্রার ধারণা নিয়ে সর্বপ্রথম এই মনীষী বিশদ আলোচনা করেছেন। পশ্চিমা বিশ্বে তখনো আধুনিক অর্থনীতির উন্মেষ ঘটেনি। যাই হোক, বর্তমান পাশ্চাত্য অর্থনীতিবিদরা এই দৃষ্টিভঙ্গি স্বীকার করে নিলেও মুদ্রাকে দ্রব্য হিসেবেও ব্যবহার করার কথা বলেন। মুদ্রাকেও তারা এক প্রকার দ্রব্য (Commodity) হিসেবে বিবেচনা করেন; যা সরাসরি ভোগ করা যায় না। তবে ভোগ নিয়ে আসে।

 

এখানে উল্লেখ্য, জিডিপির সংখ্যাভিত্তিক পরিমাণ বেড়েছে। দেশের অর্থনীতির আকার এখন প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। এসব ঠিক আছে। তবে বাস্তবতা হলো এর প্রকৃত হিসাব মূলত ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে’র মতো।
ওই আয় বৈষম্যের পেছনে দুর্নীতি, মাসল পাওয়ারসহ নানা কারণ আছে। তবে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ ‘সুদ’। যা আমরা বারবার ভুলে যাই। এই যে অর্থনীতিবিদরা সম্পদের ‘রি-ডিস্ট্রিবিউশনের’ কথা বলছেন, এটি প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে এই সুদ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মুফতি তাকী উসমানী মন্তব্য করেছেন, ‘এই সুদের কারণে দেশের ইকোনমি থেকে ফায়দা লুটে নেয় কেবল গুটিকতক লোক। (প্রাগুক্ত)

 

এই আয় বৈষম্য শুধু বাংলাদেশের চিত্র নয়। বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার চিত্রও অভিন্ন। সম্প্রতি প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে বিশ্ব অর্থনৈতিক বৈষম্য-বিষয়ক প্রতিবেদন-২০২২-এ উল্লেখ করা হয়েছে- বিশ্বের ৭৬ শতাংশ সম্পদ হোল্ড করছে বিশ্বের শীর্ষ মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ। মধ্যম শ্রেণীর ৪০ শতাংশ মানুষ হোল্ড করছে মাত্র ২২ শতাংশ সম্পদ। আর নিম্নে ৫০ শতাংশ মানুষ হোল্ড করছে মাত্র ২ শতাংশ সম্পদ।
তদ্রƒপ আয়ের ৫২ শতাংশ ধারণ করে আছে বিশ্বের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ। মধ্যম শ্রেণীর ৪০ শতাংশ মানুষ ধারণ করছে মাত্র ৩৯.৫ শতাংশ আয়। আর নিম্নে ৫০ শতাংশ মানুষ ধারণ করছে মাত্র ৮.৫ শতাংশ আয়।
এ বিষয়ে আরেকটি তথ্য উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হচ্ছি-

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে গত জানুয়ারি-২০২০-এ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আন্তর্জাতিক বাৎসরিক সম্মেলন। এ উপলক্ষে আন্তর্জাতিক দাতব্য ফেডারেশন ‘অক্সফাম’ তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে- ‘বিশ্বের দরিদ্রতম ৪৬০ কোটি মানুষের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি সম্পদ রয়েছে মাত্র দুই হাজার ১৫৩ জন শীর্ষ ধনীর হাতে। দরিদ্রতম এ মানুষগুলো দুনিয়ার মোট জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশ’। (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২১ জানুয়ারি-২০২০)

 

মোট কথা, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ও সুদের ভয়াল থাবায় এভাবেই সমগ্র মানুষের সম্পদ মাত্র গুটিকতক লোকের কাছে আটকে যাচ্ছে। এখানে বলে রাখা ভালো, সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার পেছনে সুদ ছাড়া আরো কিছু ফিন্যান্সিয়াল অ্যাক্টিভিটিস দায়ী। যেমন- ডেরিভেটিভস ইত্যাদি। তবে সুদই মুখ্য।

৩. ইকোনমিক ক্রাইসিস
সুদের তৃতীয় প্রধান অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক ক্ষতিকর দিক হলো- অর্থনৈতিক সঙ্কটও তৈরি হওয়া। এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বৃহৎ দু’টি ইকোনমিক ক্রাইসিসের প্রধান কারণের একটি হলো সুদ।
ইতিহাসে ১৯৩০ সালের ইকোনমিক ক্রাইসিস খুবই বিখ্যাত। এ সময় ওই ক্রাইসিস কেন হলো, উত্তরণের উপায় কী তা গবেষণা করে গবেষণা টিম মন্তব্য করেছিল-

“In order to ensure that money performs its true function of operating as a means of exchange and distribution, it is desirable that it should cease to be traded as a commodity.Ó (The Repot of Economic Crisis Committee, Southampton Chamber of Commerce, 1933, part 2)

বলার অপেক্ষা রাখে না, মুদ্রাকে দ্রব্য হিসেবে ব্যবহারের অর্থই সুদ চর্চা করা। ২০০৮ সালের ইকোনমিক ক্রাইসিসের পেছনেও মূল কারণ হিসেবে প্রখ্যাত ইসলামী অর্থনীতিবিদ মুফতি তাকী উসমানী মোট চারটি কারণ দেখিয়েছেন। এর মাঝে প্রথমটিই হলো সুদ। অর্থাৎ মুদ্রাকে দ্রব্যের মতো বিনিময়যোগ্য হিসেবে ব্যবহার করা। তিনি লিখেছেন, In order to save the world from such evil consequences, trading in money itself should stopped. (Causes and remedies of the present financial crisis from Islamic perspective, by Mufti Muhammad Taqi Usmani)

 

৪. সুদ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে
সুদের অন্যতম আরেকটি ক্ষতিকর দিক হলো- সমাজে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়। এ পদ্ধতি বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সুদ কিভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করে ফেলে, ধনী-গরিবের মাঝে অস্বাভাবিক তফাত তৈরি করে তাও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নিচে একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা হলো-

ধরুন, কামাল সাহেবের ব্যবসার জন্য এক কোটি টাকা প্রয়োজন। তিনি কাপড় তৈরি করবেন। ব্যাংকের দ্বারস্থ হলেন। ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা সুদের শর্তে লোন নিলেন। এখানে বলে রাখি, এই টাকা যদিও ব্যাংক দিয়েছে তবে এ টাকা যে সাধারণ জনগণের তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

টাকা নিয়ে ব্যবসা করা হলো। ধরে নিলাম ব্যবসায় শতভাগ লাভ হয়েছে। অর্থাৎ এক কোটি টাকা এখন দুই কোটি হয়ে গেছে। এর থেকে মাত্র ৯ শতাংশ অর্থাৎ ৯ লাখ টাকা ইন্টারেস্ট বাবদ ব্যাংককে দেয়া হলো। তারপর ব্যাংক এখান থেকে তার যাবতীয় কমিশন এবং খরচ রেখে ৪ শতাংশ ডিপোজিটরদের দিলো। যারা এই টাকার মূল মালিক।
ফলাফল দাঁড়াল এই, যাদের পয়সা ব্যয়ে এত লাভ হলো তাদের কপালে জুটল কেবল ১০০ টাকায় চার টাকা। অথচ বেচারা ডিপোজিটর বড় খুশি যে, আমার ১০০ টাকা ১০৪ হয়ে গেছে।

কিন্তু তার এই বাস্তবতার খবর নেই যে, তার টাকায় যে লাভ হয়েছে তাতে তার প্রাপ্তিতে আরো অধিক মুনাফা যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। আরো তিক্ত বাস্তবতা হলো এই যে, পরে তার লাভের চার টাকাও ঋণগ্রহীতা তথা শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী পণ্যমূল্য বাবদ তার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। শুধু চার নয়, কখনো মূলও চলে যায়।

তা এভাবে যে, ব্যবসায়ী যখন পণ্যটি বাজারে ছাড়ে, তখন সে এর মূল্যের মধ্যে পণ্য তৈরির অন্যান্য খরচের সাথে ব্যাংক ইন্টারেস্টও যোগ করে দেয়। পণ্যের বাস্তব খরচ যদি হয় ১০ টাকা। তবে ইন্টারেস্টের কারণে তা হয় ১২-১৫ টাকা। এখন ওই ডিপোজিটর যে ১০০ টাকায় ১০৪ টাকা পেয়েছিল; তাকে এই কাপড় বাজার থেকে ৪ শতাংশের বেশি দিয়েও কখনো কিনতে হয়। ফলাফল এই দাঁড়াল, একদিকে ব্যাংক তাকে ৪ শতাংশ লাভ দিলো; অন্যদিকে সে ৫-৬ শতাংশ বেশি খরচ করতে বাধ্য হয়।

এই ডিপোজিটর তো খুশি যে, আমার ১১০ টাকা মিলে গেল। অথচ বাস্তবে সে ১০০ টাকার বিনিময়ে ৯৫ টাকা পেল। কেননা ৪ শতাংশ তো সে কাপড় কিনতে ব্যয় করে ফেলেছে। অথচ অন্যদিকে ৯১ শতাংশ লাভ ঋণগ্রহীতার পকেটে চলে গেল। অতএব বোঝা গেল, সুদ সরাসরি বাজারের দ্রব্যমূল্যে প্রভাব বিস্তার করে। পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তোলে। এর বিপরীতে যদি মুশারাকাভিত্তিক ফিন্যান্স করা হয়, তাহলে দৃশ্যপট হবে এরূপ-
সুদি চুক্তির পরিবর্তে যদি মুশারাকা চুক্তি হতো এবং উভয় পক্ষ তথা পুঁজিদাতা এবং ব্যবসায়ীর মাঝে এভাবে লাভ বণ্টন হতো যে, ৫০ শতাংশ লাভ পুঁজিদাতা এবং ৫০ শতাংশ লাভ ব্যবসায়ী পাবে। তাহলে এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৩০-৪০ শতাংশ লাভ পেত (বাকিটা পেত ব্যাংক)।

উপরন্তু এই ৩০-৪০ শতাংশ লাভ পণ্যের মূল্য বাবদ (অর্থাৎ সুদি চুক্তিতে যা ৫-৪ শতাংশসহ পণ্যের মূল্যের সাথে যুক্ত হতো) কর্তিত হতো না। কেননা ব্যবসায়ের লাভ তো ওই পণ্য বিক্রয়ের পর সামনে আসবে। সুতরাং পণ্য বিক্রয়ের সময় বা পণ্যের মূল্য নির্ধারণের সময় মূল্যের সাথে আদায়যোগ্য কোনো ঋণ সংযোজনের সুযোগ নেই। বরং ব্যবসায়ী বাজারের স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে বিক্রয়ের পর মুনাফা অর্জন করবে।
পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের পর তা বণ্টন হবে। পণ্য বিক্রয়ের আগে নয়। (অপরদিকে সুদি লোনে পণ্য বিক্রয়ের আগেই লোন বিয়োগ করতে হয়। তাই মূল্য নির্ধারণের সময় লোনকে মূল মূল্যে যোগ করা হয়) এভাবে মুদারাবা-মুশারাকার মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়।

দু’টি সংশয় ও নিরসন
সবশেষে এ বিষয়ে দু’টি সংশয় ও তার নিরসনের উল্লেখ করে আলোচনার সমাপ্তিতে যাব-
১. মুদ্রা বেচাকেনা করা, দ্রব্যের মতো মুদ্রার ব্যবহার নিষিদ্ধের অর্থ এ নয় যে, বৈদেশিক মুদ্রার আদান-প্রদানও নিষিদ্ধ। বরং এটি বৈধ। কারণ এখানে লেনদেনের বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে। তবে শর্ত হলো- সেই লেনদেনটা হতে হবে বাস্তবভিত্তিক। স্পেকুলেশনভিত্তিক না হতে হবে। তবে বাস্তবতা হলো- বিশ্বে আন্তর্জাতিক মুদ্রার অধিকাংশ লেনদেন হয়ে থাকে স্পেকুলেশনভিত্তিক। বাস্তব প্রয়োজনে এর ব্যবহার মাত্র ২ শতাংশ।

২. সুদভিত্তিক লেনদেন বন্ধ করে দিলে ব্যাংকিং লেনদেন, ব্যবসায়িক ঋণ কিভাবে সমাধান হবে? এর উত্তর হলো- এক্ষেত্রে আমাদেরকে সুদের বিকল্প তালাশ করতে হবে। ইতোমধ্যে পাশ্চাত্য অর্থনীতিবিদরাও তাদের মতো করে এর বিকল্প অনুসন্ধান করছেন। কিছু সমাধানও দিয়েছেন। বাস্তবে কিছু অনুশীলনও হয়েছিল। তবে প্রভাবশালী ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে বাধা আসায় তা অগ্রসর হয়নি।

এক্ষেত্রে Margrit Kenney-র লেখা Interest and Inflation free money বইটি পড়া যেতে পারে। তিনি তাতে এ বিষয়ক বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকার কথা বলেছেন। তাতে বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্যোগী কিছু অর্থনীতিবিদ সুদমুক্ত ফিন্যান্স অনুশীলন করেছিলেন। তবে তা পরবর্তীতে বন্ধ করে দেয়া হয়।

মূলত যে বিষয়টি বলা উদ্দেশ্য, সুদের বিকল্প নিয়ে পাশ্চাত্য অর্থনীতিবিদরাও আলোচনা করছেন, ভাবছেন। বোঝা গেল এটি পরিহারযোগ্য। এক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে ইনসাফপূর্ণ বিকল্প পথ হলো- ডিপোজিটরদের টাকা থেকে যে মুনাফা ঋণগ্রহীতারা অর্জন করবে, তাতে সরাসরি ডিপোজিটরদেরও অংশগ্রহণ করানো। ব্যবসায়ীরা এতে রাজি থাকবে, কারণ ডিপোজিটররা মুনাফার পাশাপাশি লোকসানেও অংশগ্রহণ করবে। তবে এতে চ্যালেঞ্জ হলো- শুধু এক-দুই ব্যাংক তা শুরু করলে বাধার সম্মুখীন হবে। অন্যান্য ব্যাংকগুলো সহজে ঋণ দিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করার বিকল্প নেই। সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা কঠিন নয়। ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এর কিছুটা প্রয়োগ হচ্ছে। এতে সুদের বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এটি প্রশংসিত। তবে এর আদর্শিক প্রয়োগ ও আরো অধিক ভারসাম্য ব্যবস্থা নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি জাতীয়ভাবে ধীরে ধীরে সুদ থেকে বের হয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

এখানে এটিও বলে রাখা ভালো যে, সুদ বা ঋণভিত্তিক ফিন্যান্স নিষিদ্ধ করার অর্থ এ নয় যে, সব ধরনের ঋণভিত্তিক লেনদেন নিষিদ্ধ করা। বরং করজে হাসানা, বাকি বিক্রয়, ইএমআই ভিত্তিক লেনদেন শরিয়াহসম্মত উপায়ে করতে সমস্যা নেই। যেগুলোর বিপরীতে সরাসরি প্রডাক্ট থাকবে। সুদ থাকবে না।

শেষ কথা
সুদ পরিত্যাগ করতে হবে। এটিই মুক্তির একমাত্র পথ। এ দাবি শুধু যে মুসলিম অর্থনীতিবিদদের, তা নয়। পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদরাও এখন তা বলছেন। সুতরাং আমাদেরকে পার্থিব সার্বিক অর্থনৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছাড়তে হবে। শেষ করছি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের চেয়ারম্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য উল্লেখ করে, যেখানে তিনি প্রচলিত অর্থব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থা প্রকাশ করে বলছেন-

‘Today we have reached a tipping point, which leaves us with only one choice: change or face the continued decline and misery.” (Causes and remedies of the present financial crisis from Islamic perspective, by Mufti Muhammad Taqi Usmani. P.32.)’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *