সভ্যতা বিনির্মাণে ওয়াকফ

লুকমান হাসান

উস্তাযুল হাদীস, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা

CSAA, AAOIFI

ইসলামের গৌরবময় একটি ইতিহাস রয়েছে। যেখানে শিক্ষাসভ্যতার উন্নতি ছিল সবার শির্ষে। সেসময় যে কোন পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণ করার অধিকার সবার জন্য সমান ছিল। অর্থবিত্তাভাব কাউকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বিরত করেনি। এই গৌরবময় ইতিহাস রচিত হয়েছিল যে ব্যবস্থার কারণে, তাহল ওয়াকফ।

বর্তমান বিশ্বেও শিক্ষার সকল পর্যায় সবার জন্য উন্মুক্ত করতে ওয়াকফ ব্যবস্থা প্রধানতম ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিমধ্যে মালয়েশিয়াসহ মধ্য প্রাচ্চের অনেক দেশে শিক্ষা খাতে ওয়াকফভিত্তিক অর্থায়নে অনেক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া অতীতের ইসলামী শাসনামলে শিক্ষাখাতসহ রাষ্ট্রীয় বাজেট ঘাটতি পূরণেও ওয়াকফের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, বর্তমানে ওয়াকফ ব্যবস্থা সাধারণ একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অসম্পূর্ণ ধারণায় সীমাবদ্ধ করণ করা হয়েছে। যা তার বিপুল সম্ভাবনাকে সঙ্কোচিত করেছে। অবশ্য ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন প্রভৃতি কিছুটা ওয়াকফের বিকল্প বলা যায়। তবে এ দুয়ের মাঝে পার্থক্য রয়েছে।

ওয়াকফ ট্রাস্ট

ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন, এন্ডোমেন্ট (ঊহফড়সিবহঃ) ইত্যাদির ধারণাগুলো ওয়াকফ থেকে নেওয়া হয়েছে। ওয়াকফের বিচিত্র খাত ও ব্যবহার এবং জাতীয় উন্নয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণেই তা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ওয়াকফ অন্যগুলোর চেয়ে বৈশিষ্ট্যে এবং তাৎপর্যে সম্পূর্ণ আলাদা। উদাহরণত ওয়াকফের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নি¤েœ তুলে ধরা হল। 

ওয়াকফে কিছু বৈশিষ্ট্য

. ওয়াকফ একটি দান। আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহ. বলেন,

بر الأحباب وفي الآخرة بالثواب

ওয়াকফের উপকার দুইটি। একটি পার্থিব এবং আরেকটি আখেরাতের। প্রথমটি হলো প্রিয়দের (মানুষের) প্রতি মানবিক আচরণ করা হয়। আর দ্বিতীয়টি হলো, আখেরাতে তার সওয়াব লাভ হয়।

অন্যান্য দানের চেয়ে এতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। অন্যান্য দানে কেবল আখেরাতের সওয়াব লাভ করা যায়। ঐ দান থেকে নিজে উপকৃত হওয়ার সুযোগ থাকে না। কিন্তু ওয়াকফের মাধ্যমে ওয়াকফকারী ব্যক্তি ও তার বংশধর এবং সমাজের বিত্তবান শ্রেণীও উপকৃত হওয়ার সুযোগ পায। এমনকি অমুসলিম ও অন্যান্য প্রাণীদের জন্যও ওয়াকফ করা যায়। তাই ওয়াকফ দানের মাধ্যমে যেমনটা সমাজের বৈধ সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাÐগুলোতে অর্থায়ন  করা যায়, তা অন্য দানের মাধ্যমে হয় না।

. ওয়াকফ সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার একটি আদর্শ ব্যবস্থা। ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ, সবার প্রতি মানবতাবোধ এমনকি অন্য প্রাণীর প্রতি দয়া ও অনুকম্পার মানসিকতা থেকে সৃষ্ট চেতনার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা একে অপরকে কল্যাণ ও তাকওয়ার উপর সহযোগিতা করো।” (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ০১)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মুমিনদের পারস্পরিক দয়া ভালোবাসা ও অনুগ্রহের উদাহরণ হলো, তারা একটি দেহের মতো। যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে সমস্ত শরীর তার জন্য রাত জাগে এবং জ¦রের কষ্ট ভোগ করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৫৮৬) 

. ওয়াকফের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এটি একটি টেকসই অর্থায়ন পদ্ধতি। কারণ, ওয়াকফের মাধ্যমে প্রপার্টির মালিকানা ব্যক্তি থেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা হয়ে যায়। যার ফলে অভাবীদের জন্য সবসময় তার সহযোগিতা চলমান থাকে।

শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমবিকাশে ওয়াকফের সোনালি অতীত

পৃথিবীর বুকে সভ্যতার আলোকবর্তিকার সূচনা হয় কলম দ্বারা। তার পরের ধাপে গ্রন্থ প্রণয়ন, গ্রন্থাগার নির্মাণ এবং বিদ্যালয়, মসজিদ মাদরাসা, মহাবিদ্যালয় ও বিশ^বিদ্যালয় স্থাপন প্রভৃতি। কুরআনের প্রথম শব্দটি ছিলো, ‘পড়ো আর চতুর্থ আয়াতটি ছিলো, “যিনি শিক্ষা দিয়েছেনকলমদ্বারা” (সূরা আলাক, আয়াত নং ০৪)

এ কারণে  দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের ১১৮ বছর পর ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা তথা স্পেন হতে আরম্ভ করে ভারতের সিন্ধু পর্যন্ত ইসলামি সভ্যতার বিস্তার ঘটে (চেপে রাখা ইতিহাস, পৃ. ২৪)  কারণ, শিক্ষার ব্যাপারে মুসলিমদের গুরত্ব ছিলো সবচেয়ে বেশি। অপরদিকে মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থা বিস্তৃতির পেছনে প্রধান অর্থনৈতিক কারণ ছিলো ইসলামের ওয়াকফ ব্যবস্থা। সামনের আলোচনায় ইতিহাসের কয়েকটি চিত্র থেকে বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারব।

ইসলামের শিক্ষাসূচনা ওয়াকফ সূচনা

শিক্ষার জন্য প্রথম নির্দেশ অবতীর্ণ হয় ৬১০ঈসাব্দের মাঝামাঝিতে। তখন মক্কায় পরিস্থিতির প্রতিকূলতা ও বাধাঁবিপত্তির মধ্যেও অনিয়মতান্ত্রিক কয়েকটি জায়গায় শিক্ষার ধারা জারি ছিলো। যেমন, দারুল আরকাম, ফাতেমা বিনতে খাত্তাবের গৃহ, শিআবে আবি তালিব প্রভৃতি। এগুলো কোনো নিয়মতান্ত্রিক ওয়াকফ কৃত শিক্ষালয় ছিলো না। (খাইরুল কুরূন কি দরসগাহেঁ, মাওলানা কাজী আতহার মুবারকপুরী, পৃ. ১১)

মদীনায় হিজরতের পর নিয়মতান্ত্রিক পাঠদান পদ্ধতি ছিলো দুই ধরণের। যথা: 

এক. বিভিন্ন অ ল থেকে গোত্রের প্রতিনিধি হয়ে কিছু মানুষ এসে ১০/২০ দিন মদীনার মসজিদের নববীর চত্বরে অবস্থান করতো এবং ইসলামের বিধিবিধান ও নিয়মকানুন শিখে পুনরায় গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকেও এরা ইসলাম শিখাইতো। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮০৪; সূরা তাওবা, আয়াত ১২২ ) 

দুই. দূরদূরান্ত থেকে আগত অনেক শিক্ষার্থী অবস্থান করে ইলম শিখত। তাদের আবাস ছিলো সমজিদে নববীর এই চত্বরটি। যাকে বলা হতো সুফফা। আর এখানে থেকে যারা ইসলামইলম শিখত তাদেরকে বলা হতো আসহাবুস সুফফা (সহীহ বুখারী, হাদীস নং৪৪২) মসজিদে নববীতে শিক্ষার বিভিন্ন চক্র হতো। আবু বকর রা., উবাই ইবনে কাব রা., উমর রা. –সহ অনেকে সেখানে কুরআন শেখাতেন। এরপর একই নিয়মে ইসলামের প্রথম ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান, মসজিদে কুবাতেও কুরআন শিক্ষার এই ধারা অব্যাহত ছিলো। পরবর্তীতে মসজিদ কেন্দ্রিক শিক্ষার এ ধারা ব্যপক বিস্তৃতি লাভ করে। যার ফলে প্রাই হিজরী তৃতীয় শতাব্দি পর্যন্ত মসজিদই ছিলো শিক্ষাঙ্গন।

তাই যেখানেই মুসলমান ছিলো, সেখানে কোনো মসজিদও ওয়াকফ করা হতো, যা ইলম ও ইসলামের জন্য কেন্দ্র গণ্য করা হতো। 

সাহাবী যুগে ওয়াকফ শিক্ষা ব্যবস্থা

আবু বকর সিদ্দীক রা. এর যুগে ধর্মান্তরের ফিতনা মোকাবেলাতেই বেশি মনোযোগ ছিলো। উমর রা. এর যুগে ইসলামী সা¤্রাজ্যের বিস্তৃতি লাভ করলে তিনি শিক্ষক হিসাবে সিরিয়া, কূফা, বসরা সহ বিভিন্ন অ লে আলেম সাহাবীদেরকে প্রেরণ করেন। তারা সেখানে পৌঁছে মসজিদে মসজিদে পাঠদানের জন্য বসে যেতেন। যেমন, তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-কে কূফা নগরীতে পাঠাইলে তিনি জামে কূফাতে পড়াতে শুরু করেন। 

বাচ্চাদের শিক্ষার জন্য প্রত্যেক অ লেই মসজিদ কেন্দ্রিক মকতবও তিনি চালু করেন। যারা কুরআন হিফয করতো, তাদেরকে বিশেষভাবে তিনি পুরস্কৃত করতেন (খাইরুল কুরূন কি দরসাগাহেঁ, পৃ. ১৪)

সাহাবী যুগেই ব্যক্তিগত ও জাতীয় গ্রন্থাগারও গড়ে ওঠেছিলো প্রচুর। যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী যুগে বিশাল বিশাল পাঠাগার গড়ে ওঠেছিলো।

গোলাম মোর্তজা লিখেছেন, “গ্রন্থ বা পুস্তক সংগ্রহ মুসলমানদের জাতীয় স্বভাবে পরিণত হয়েছিলো। বন্দরে বন্দরে লোক প্রস্তুত থাকতো। কোনো বিদেশী তার কাছে যে বইপত্র আছে সেগুলো নিয়ে অজানা তথ্যের বইগুলো সাথে সাথে অনুবাদ করে তার কপি তৈরি করে তার বই ফেরৎ দেওয়া হতো। আর তাঁদের অনিচ্ছা না থাকলে তা কিনে নেওয়া হতো।” (চেপে রাখা ইতিহাস, পৃ. ২৫)

মুসলমানগণ বিভিন্ন অ ল জয় করে সেখানে থাকা কোনো গ্রন্থ বা বই তারা কখনো বিনষ্ট করতেন না। মিঃ গীবন বলেন, আরবরা বিধর্মীদের গ্রন্থাদি বিনষ্ট করা পছন্দ করতেন না। তাদের ধর্মীয় নীতি একাজ সমর্থন করে না। (চেপে রাখা ইতিহাস, পৃ. ২৫)

উমাইয়া শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থা ওয়াকফ

উমাইয়া আমলে পুরো মুসলিম জাহানে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য মকতব কায়েম করা হয়। বিখ্যাত কবি আল কুমাইত ইবনে আসাদী কূফা শহরে এমনি একটি মকতবে ছোট ছেলেমেয়েদের শিক্ষক ছিলেন। 

বিখ্যাত পর্যটক ইবনে হাওকাল রহ. একটি মফস্বল এলাকাতে মকতব প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব করেছিলেন। যার সংখ্যা ছিল তিন শ আর মকতবগুলো এত প্রশস্ত হতো যে, কোনো কোনো মকতবে কয়েকশ এবং কয়েক হাজার পর্যন্ত শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ পেতো। যেমন আবুল কাসেম বালখি রহ. এর একটি মকতব ছিলো, যেখানে ৩ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করতো। মকতবের আয়তন এত বিশাল ছিলো যে, গাধার পিঠে চড়ে তিনি ছাত্রদের তদারকি করতে হতো (মুসÍফা সিবাঈ, মিন রওয়াইহাযারাতিনা, পৃ. ২০৫২০৬)

আর উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বৃহদায়তন মসজিদগুলোই তখনো মাদরাসা ও বিশ^ বিদ্যালয় হিসাবে ব্যবহৃত হতো। 

জামে উমাবী

উমাইয়া শাসনামলে মসজিদসমূহে পঠনপাঠনের স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী চক্র কায়েম করা হয় এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ভাতা ও বৃত্তি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।( ইসলামী বিশ^কোষ, .১৭ পৃ.২৬৯)

উমাইয়া শাসনামলের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ওয়াকফ হচ্ছে, দামেশকের জামে উমাবী। যা আজও ইসলামী সভ্যতার সুউচ্চ নিদর্শন হয়ে টিকে আছে। এটি নির্মাণ করা হয়েছিলো ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে। সে মসজিদটি নির্মাণে রাষ্ট্রীয়ভাবে যে গুরুত্বারোপ করা হয়েছিলো, নিচের ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। 

ইসলামী সা¤্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সুদক্ষ ১২ হাজার কারিগরকে একত্রিত করা হয়। মসজিদটি নির্মাণে ব্যয় করা হয় ৪শবাক্স স্বর্ণ। প্রতিটি বাক্সে ছিলো ২৮ হাজার লাল (খালেস সোনার) দিনার। নির্মাণে সময় লেগেছে ২০ বছর। মসজিদের মাঝখানে একটি স্তম্ভে মরমর পাথর যুক্ত করা হয়। যা ক্রয় করা হয়েছিলো ১ হাজার ৫শত দিনার ব্যয় করে।’ (রাগেব সারজানী, রওয়াইউল আউকাফ ফিল হাযারাতিল ইসলামিয়্যাহ, ৯০)

আব্বাসী শাসনামলে শিক্ষা খাতে ওয়াকফ

আব্বাসী শাসকগণ ইসলামী শিক্ষাসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে পৌঁছিয়েছেন। তার কিছু উদাহরণ সামনে উল্লেখ করা হলো। 

ফাখরুদ দাওলা ইবনে মুত্তালিব (মৃ. ৫৭৮হি.) ওয়াকফ করেছিলেনদারুয যাহাবনামের প্রসিদ্ধ একটি মাদরাসা। তার জন্য আরো বহু ভূমিসম্পত্তি ওয়াকফ করেছিলেন। যা থেকে মাদরাসার জন্য বার্ষিক আয় ছিলো ১ হাজার ৫শদিনার। সেখানে একটি বিশাল জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। এতে তিনি প্রায় ৩০ হাজার দিনার ব্যয় করেছেন। মসজিদের জন্যও সুবিশাল ভূমি ওয়াকফ করেছিলেন। (রাগেব সারজানী, রওয়াইউল আউকাফ ফিল হাযারাতিল ইসলামিয়্যাহ, ৯০.)

ঐ যুগের আলেমগণেরও মাদরাসা ওয়াকফের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিলো। কিতাব, সম্পদ, ঘরবাড়ি ইত্যাদি তারা ওয়াকফ করতেন। খতীবে বাগদাদী (মৃ.৪৬৩ হি.) মৃত্যুর পূর্বে তাঁর সমস্ত গ্রন্থ মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে গিয়েছিলেন। (তারিখু মাদীনাতি দিমাশক, ইবনে আসাকির, .৫ পৃ.৩৯)

ইরাকের মুসেল নগরীতে আবুল কাসেম জাফর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হামদান (মৃ.৩২৩ হি.) একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার নাম দিয়েছিলেনদারুল ইলম সেখানে তিনি সকল শাস্ত্রের গ্রন্থভাÐার জমা করেছিলেন। পাঠাগারটি তিনি শিক্ষার্থী ও বিদ্যানুরাগীদের জন্য ওয়াকফ করেছিলেন। তার পাঠাগার ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। বিদেশি কোনো শিক্ষার্থী আসলে এবং সে অভাবি হলে তাকে ফ্রি কিতাবাদি ও টাকাপয়সা দেওয়া হতো। (রাগেব সারজানী, মিন রওয়াঈয়িল আওকাফ)

আব্বাসী খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ এবং আশেপাশের বড় নগরীগুলোর মধ্যেই শিক্ষা কেন্দ্রিক ওয়াকফের প্রবণতা সীমাবদ্ধ ছিলো না। যেমন ৪১৫ হি. সনে কাযবীনের আমীর আবু তাহের ইবনে আবু আলী জামে মসজিদের গেট সংলগ্ন একটি দারুল কুতুব (পাঠাগার) নির্মাণ করেন। সাথে তার জন্য প্রচুর ভূমি ওয়াকফ করেন। 

ইবনে হাওকাল (মৃ.৩৬৭হি.) হিরাত নগরীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, শহরের ভিতরে রয়েছে জামে মসজিদ। আর মসজিদ এরিয়ার ভিতর রয়েছে হাটবাজার। কিবলার দিক থেকে মসজিদের পেছনেই রয়েছে জেলখানা। এই জামে মসজিদটি রাতদিন এতটায় আবাদ থাকে যে, মাওয়ারাউন নাহার, সিজিস্তান এবং বলখেও আমি তা দেখি নি। অথচ উক্ত নগরীসমূহের মসজিদগুলো ফকীহ, আলেম ও শিক্ষার্থীদের ভিড়ে সর্বদা ঠাসা থাকে।( আলমাসালিক ওয়াল মামালিক, ইবনে হাওকাল, পৃৃ.৩১৭) 

৩৫৯হি./৯৭০ঈ. সনে ফাতেমী সেনাপতি জাওহার আল কাতিব ওয়াকফ করে জামে আযহার এর ভিত্তি স্থাপন করেন। 

৩৯৫হি. সনে ফাতেমী শাসনকর্তা আল হাকিম বি আমরিল্লাহ কায়রোতে দারুল ইলম নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়াকফ করেন। উক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহের জন্য ফুসতাত নগরীতে বহু গৃহ ওয়াকফ ছিলো।

চতুর্থ হিজরী শতকের শেষদিকে মাদরাসার জন্য স্বতন্ত্র ইমারত নির্মাণ করার প্রথা শুরু হয়। মুসলিম জাহানে সর্বপ্রথম নিশাপুরে মাদরাসার জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিলো। (মিন রওয়াঈয়িল আওকাফ, রাগেব সারজানী, পৃ. ৯৯)

সুলতান মাহমূদ গযনবী মথুরা জয় করার পর গযনীতে ফিরে যাওয়ার পর আনুমানিক ৪১০হি. সনে নিশাপুরে একটি আলিশান মাদারাসা কায়েম করেন। সাথে একটি লাইব্রেরীও ওয়াকফ করেন। 

ওয়াকফের ভিত্তিতে লাইব্রেরী পাঠাগার নির্মান

আব্বাসী খেলাফতকালে পাঠাগার ব্যবস্থা চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। গ্রন্থ ও পাঠাগারের প্রতি মুসলমানদের অনুরাগ শুরু থেকে থাকলেও আব্বাসী খেলাফতকালে তা একাডেমিকভাবে এতটাই উন্নতি লাভ করেছিলো যে, বাগদাদের সুবিশাল পাঠাগারের বর্ণনা থেকে তা অনুমান করা যায়।

বাগদাদের পাঠাগার

এই পাঠাগারটি প্রায় পাঁচ শতাব্দিকাল ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাঠাগার বলা হলে অত্যুক্তি হবে না। এই পাঠাগারে কি পরিমাণ গ্রন্থ ছিলো তা অংকে বলা সম্ভব নয়। তবে হিসাব কষলে তা কয়েক মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতো। এটি সে যুগের কথা, যখন কোনো ছাপা যন্ত্র ছিলো না। যখন গ্রন্থ লেখার জন্য হস্তলিপিই ছিলো একমাত্র মাধ্যম। এই পাঠাগারে বহু সংখ্যক কামরা ছিলো। প্রত্যেক শাস্ত্রের কিতাবাদির জন্য ছিলো আলাদা আলাদা কামরা। কোনো কোনো শাস্ত্রের কিতাবাদির জন্য ছিলো একাধিক কামরা। পাঠাগারটির জন্য ছিলো বেতনভুক্ত কয়েকশ কর্মচারী। সেখানে একদল লিপিকার ছিলেন, যারা প্রত্যেকটি কিতাবের একাধিক কপি করতেন।

খলীফা মামুনুর রশীদ রোমান স¤্রাটের বিরুদ্ধে জয়লাভের পর সন্ধি চুক্তির সময় এই প্রস্তাব করেছিলেন যে, ইস্তাম্বুলের পাঠাগারে যেসব কিতাব আছে, মুসলিম অনুবাদকদেরকে যেনো সেসব কিতাবাদি অনুবাদ করার সুযোগ দেওয়া হয়। এক কথায়, সেই পাঠাগারে ততকালীন বিশে^র সকল জ্ঞানবিজ্ঞানের কিতাবাদি সংগৃহিত ছিলো।

তাতারীরা যখন হামলা করলো, তখন বাগদাদের এই পাঠাগারটি তারা দাজলা (টাইগ্রিস) নদীতে নিক্ষেপ করেছিলো। কিতাবের দোয়াত কালি পানিতে মিশে গোটা দাজলা নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিলো। (তাতারীদের ইতিহাস, অনুবাদ মাওলানা আব্দুল আলীম, .১৮২১৮৩)

বাগদাদের মাদরাসা নিযামিয়্যাহ

ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত বিশ^বিদ্যালয় হিসাবে গণ্য করা হয় নিযামিয়্যাহ মাদরাসাসমূহকে। ওযীর নিযামুল মুলক তূসী (মৃ. ৪৮৫হি.) রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভার্সিটি পর্যায়ের এ মাদরাসাগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি আবাসন ব্যবস্থা, মাসিক বৃত্তিসহ সবরকমের সুবিধা প্রস্তুত ছিলো। এর মধ্যে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ মাদরাসাটি ছিলো বাগদাদের মাদরাসা নিযামিয়্যাহ। যা ৪৫৭হি. সনে নির্মান শুরু করে ৪৫৯হি. সনে সমাপ্ত হয়। সেখানে হাদীস ও ফিকহ সহ সে সময়ের সকল শাস্ত্রের উপর সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা ছিলো।

মাদরাসা মুসতানসিরিয়্যাহ

তখনকার সময়ে বিশে^র সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ হিসাবে পরিচিত ছিলো এই মাদরাসা। এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিলো ৬৩১হি. সনে। এই মাদরাসায় বিদ্যানুরাগী শিক্ষক ছাত্রদের প্রতি খেলাফতের যে আলাদা মনোযোগ ছিলো তা ইবনে কাসীর রহ. এর বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়।

ইবনে কাসীর রহ. বলেন, “ইতিপূর্বে অনুরূপ কোনো মাদরাসা আর প্রতিষ্ঠিত হয় নি। মাদরাসাটি চারও মাযহাবের জন্য ওয়াকফ করা হয়। প্রতি মাযহাবের জন্য ২৬০ জন করে ফকীহ শিক্ষক ও চার জন করে পরিচালক নিযুক্ত ছিলেন। প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে শিক্ষক ও হাদীসের শাইখ এবং দুইজন করে কারী (উস্তাযের সামনে যে হাদীস পাঠ করে) নিযুক্ত থাকত। প্রতি একজন চিকিৎসকের সাথে দশজন ছাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে ব্যস্ত থাকত। এতিমদের জন্য ছিলো আলাদা বিভাগ। সকলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ রুটি, হালুয়া, গোশত ও অন্যান্য খরচ এই পরিমান দেওয়া হতো, যা দিয়ে তাদের অনায়াসে চলা সম্ভব হতো। এই মাদরাসার জন্য কিতবাদির জন্য সুবিশাল ওয়াকফ ছিল। কিতাবাদির সংখ্যাধিক্যের কারণে তার হিসাব রাখা সম্ভব হয় নি। তেমনি সুলিপি ও উৎকৃষ্ট বাধাইয়ের দিক থেকেও উক্ত পাঠাগারের কিতাবগুলো ছিল তৎকালীন সময়ে অতুলনীয়। (বিদায়া  নিহায়া, ইবনে কাসীর, . ১৩ পৃ.১৬৩)

ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, উক্ত মাদরাসার মুদাররিস (শিক্ষাগুরু) –সহ অন্যান্য বেতনভুক্ত কর্মী ছিলেন ৫শ এর মতো। আমি বিশ^স্ত মাধ্যমে জেনেছি, উক্ত মাদরাসার কোনো কোনো বছরে ওয়াকফের বার্ষিক আয় ৭০হাজার মিসকাল স্বর্ণেরও বেশি হতো।( যাহাবী, তারিখুল ইসলাম,  . ১৪ পৃ. ০৭)

জামে আযহার

সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হলো জামে আযহার। যেখানে সুপ্রাচীনকালেও ছাত্রদের জন্য আলাদা ছাত্রবাস ছিলো, যেগুলোকেরওয়াকবলা হতো। তুর্কি, সিরিয়া, মরক্কো, সুদান সহ বিভিন্ন অ লের ছাত্রদের জন্য আলাদা রওয়াক থাকতো। সেখানে ছাত্রদের ফ্রি পড়াশোনার পাশাপাশি মাসিক বৃত্তিও দেওয়া হতো। (মুসতফা সিবাঈ, মিন রওয়াইহাযারাতিনা, পৃ. ২০৫২০৬)

তাছাড়া কর্ডোভা, গ্রানাডা, ইসাবেলা  এবং সাবাকুসতা প্রভৃতি এর জামে মসজিদ ছিলো কেন্দ্রিয় বিশ^বিদ্যালয়ের মতো। সেখানে কর্ডোভার জামে মসজিদে ফিকহ, জ্যোতিবিদ্যা, গণিত এবং চিকিৎসা শাস্ত্রও শিক্ষা দেওয়া হতো। এই বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদের সংখ্যা হাজার হাজার ছিলো। 

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়ালে দেয়ালে এই বচনটি উৎকীর্ণ থাকতো: পৃথিবী নামক দালানটি চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে: . জ্ঞানীদের জ্ঞান, . ক্ষমতাবানদের ইনসাফ, . নেককারদের দুআ এবং ৪. বীরদের বীরত্ব। ( ইসলামী বিশ্বকোষ, .১৭ পৃ.২৭৩)

. আলী জুমআহ তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন, সে সময় জেল হাজতে থাকা কয়েদীদের শিক্ষার জন্যও রীতিমত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ওয়াকফ করা হতো। (রাগেব সারজানী, রওয়াইউল আউকাফ ফিল হাযারাতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ.৯৫)

উল্লেখযোগ্য আরো কিছু শিক্ষা ব্যবস্থা

৬ষ্ঠ হি. শতকে মরক্কোতে জামে ইবনে ইউসুফ প্রতিষ্ঠা করা হয় ওয়াকফের ভিত্তিতে। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আলী ইবনে ইউসুফ ইবনে তাশফীন আল মুরাবিতি (মৃ. ৫৩৭হি.) তার ওয়াকফের শর্ত ছিলো এমন, “এই ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানে ফিকহ, কালাম (আক্বীদা শাস্ত্র), কুরআনবিদ্যা, ইলমে হাদীস, ইতিহাস, সাহিত্য, জুগরাফি এবং ফালসাফা (দর্শন শাস্ত্র) ইত্যাদির পাঠদানের জন্য ওয়াকফ করা হলো।” (রাগেব সারজানী, রওয়াইউল আউকাফ ফিল হাযারাতিল ইসলামিয়্যাহ, ৯৫)

জামে ইবনে ইউসুফ পরিচালিত হতো ওয়াকফ দানের ভিত্তিতে। যা সমাজের রাজনৈতিকঅরাজনৈতিক এবং আলেম ও সাধারণসহ সব স্তরের মানুষের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা হতো। এর ফলে সভ্যতাসংস্কৃতি ও ইসলামী তাহযীবতামাদ্দুনের উপর চতুর্মাত্রিক সুফল ফুটে ওঠেছিলো। 

সপ্তম হিজরী শতাব্দির উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি শিক্ষাকেন্দ্র ছিলো। মাদরাসা জোবানিয়্যা। জোবান ইবনে তাদওয়ান তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর প্রতিষ্ঠা হয় মাদরাসা শিরাযিয়্যাহ। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, ইবরাহীম রূমী (মৃ. ৭৩০হি.) নামক এক ব্যক্তি। তিনি একটি খেজুরের বাগান কিনে মাদরাসার জন্য ওয়াকফ করেছিলেন। মাদরাসার ইমারাত নির্মান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন তিনি নিজেই করেছিলেন ওয়াকফের ভিত্তিতে। 

সে সময়ের উল্লেখযোগ্য আরেকটি মাদরাসা হলো, মাদরাসা য়াযকোজিয়্যাহ হানাফিয়্যাহ এবং মাদরাসা শিহাবিয়্যাহ। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, বাদশা মুযাফফর শিহাবুদ্দিন ইবনে গাযী আইয়ূবী। 

৮ম শতাব্দির প্রসিদ্ধ মাদরাসা ছিলো, মাদরাসা গিয়াসিয়্যাহ।

৯ম শতকের প্রসিদ্ধ মাদরাসা ছিলো, মাদরাসা কালিরিজিয়্যাহ। যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সুলতান শিহাবুদ্দিন আহমাদ সুলতান কালিরজাহ। এই মাদরাসাটি সম্পর্কে আল্লামা সাখাবী রহ. বলেন, “মদীনায় বাবুর রহমাহ এর নিকটে ৮৩৮হি. সনে তিনি একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। সে মাদরাসায় তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) চেহারা মুবারকের দিকে মুখ করে ৪ হাজার ৬শতালা সমপরিমান ওজনের একটি কিন্দীল (লণ্ঠন) ঝুলিয়েছিলেন। অনুরূপ আরেকটি মাদরাসা তার মক্কার বাবুস সফার নিকটে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। 

এরপর ৮৪০হি. সনের পর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো মাদরাসা বাছিতিয়্যাহ এবং মাদরাসা যামানিয়্যাহ, মাদরাসা আশরাফিয়্যাহ বা হিসনুল আতীক (৮৮৭হি. সনে) এই মাদরাসাটি আয়তনে অনেক বড় ছিলো। মাদরাসাটির ওয়াকফ সম্পত্তিও ছিলো অসংখ্য। ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর ফসল মসজিদে নববী এবং মাদরাসার জন্য ব্যয় করা হতো। 

৮৮০ হি. সনে রুস্তম পাশা ইবনে ওযীর কাসেম পাশা প্রতিষ্ঠা করেন মাদরাসা রুস্তমিয়্যাহ।

উসমানি শাসনামলে ওয়াকফ ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা

উসমানী সালতানাতে ওয়াকফভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি ছিলো সবচেয়ে বেশি। তার একটি পরিসংখ্যান নিম্নরূপ

১৯৮২ সনে বুলগেরিয়ার বিভিন্ন শহরে অবস্থিত ৩৩৩৯টিরও বেশি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরী করা হয়েছিলো। যার মধ্যে ২৩৫৬টি মসজিদ, ১৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২৭৩টি সেতু, ১৬টি রেস্ট হাউস ও মুসাফিরখানা ছিলো। আর শুধু রাজধানী ইস্তান্বুলে ছিলো ২৫১৭টি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান। (https://www.turkpress.co/node/6845)

উসমানি খেলাফতের আওতাধীন আলজেরিয়ার ফসলি জমির চার ভাগের তিন ভাগ ছিলো ওয়াকফ সম্পত্তি। (. আলিওয়ান আসঈদ, উসামানী আমলে আলজেরিয়ার ওয়াকফ)

সারকথা

মসজিদ ছিলো ইলম ও ইসলাম শিখার প্রথম পাঠশালা। তা শুধু ইবাদতের স্থান হিসাবে ব্যবহৃত হতোএমন নয়। বরং মসজিদগুলো পড়া, লেখা, কুরআনের শিক্ষা, শরীয়ার অন্যান্য ইলম ও ভাষা শিক্ষাসহ বিভিন্ন শাস্ত্রের পাঠদানের স্থান হিসাবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী ধাপে মসজিদের পাশে মকতব প্রতিষ্ঠা করা হয়। মকতবে কুরআন পড়া ও লেখা এবং পাশাপাশি আরবী ভাষা ও গণিতের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হতো। তৎকালীন মকতবকে বর্তমান যুগের প্রাইমারি বিদ্যালয়ের সাথে তুলনা করা যায়। মুসলিম নগরীর প্রতিটি গ্রামে এবং প্রতিটি মসজিদের পাশে এ ধরণের মকতব কায়েম করা হয়েছিলো। 

তৃতীয় ধাপে চতুর্থ হিজরী শতকের দিকে মসজিদের সাথে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ধারা শুরু হয়। তৎকালীন মাদরাসা বর্তমান সময়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় এবং বিশ^বিদ্যালয় এর সাথে মিলে। মাদরাসায় সকল স্তরের পড়াশোনা করার সুযোগ হতো সম্পূর্ণ ফ্রিভাবে। তার অর্থ হচ্ছে, সে সময় ছাত্রদেরকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার পেছনে কোনো ব্যয় করতে হতো না। যা বর্তমান সময়ে বিরল ও দুঃস্কর। 

শিক্ষা তখন বিশেষ কোনো শ্রেণীর জন্য ছিলোনা। সব শ্রেণীপেশার মানুষের জন্য সমান সুযোগ ছিলো। একজন ফকীরের সন্তান নির্দ্বিধায় একজন ধনকুবের সন্তানের পাশে বসে লেখা পড়া করত। এতে কারো কোন আপত্তি ওঠত না।

মাদরাসা (উচ্চা শিক্ষা) এর জন্য দুই ধরণের ব্যবস্থা ছিলো। এক. স্থানীয়দের জন্য ব্যবস্থা। যারা সকালে পড়তে আসতো এবং পড়া শেষে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে যেতো। 

দুই. যারা দূরদূরান্ত থেকে আগমন করতোা। তাদের জন্য থাকতো খাওয়া, থাকা, ঔষধপত্র, ঘুমানোর ব্যবস্থা, ইবাদাত ও মুতালাআ (অধ্যয়ন) এর জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত ব্যবস্থা। প্রত্যেক মাদরাসা সেসময় মসজিদ কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠিত হতো অথবা বলা যায়, মাদরাসার সাথে মসজিদও প্রতিষ্ঠা করা হতো। সাথে থাকতো ক্লাস রুমের মতো বিস্তীর্ণ অনেক হল রুম, ছাত্রাবাসের মতো ঘুমানোর ব্যবস্থা, পড়ার জন্য বিশাল লাইব্রেরী, রান্নার জন্য বাবুর্চিখানা ও গোসলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। উস্তাদ ও শিক্ষকদের জন্য আলাদা বিশ্রামের কামরা এবং তারা পরিবার নিয়ে আবাসিক থাকার ব্যবস্থাও করা হতো। দামেশকের মাদরাসা নূরিয়্যাহ এখনো তার বাস্তব সাক্ষী হয়ে আছে। যার শৈল্পিক কাঠামো ও উন্নত ব্যবস্থাপনা দেখে বর্তমানের গবেষকরাও বিস্মিত হয়ে থাকেন। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে জুবাইর সপ্তম হিজরী শতকের শুরুর দিকে উক্ত মাদরাসাটি দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দরতম মাদরাসা নুরুদ্দিন মাদরাসা।

এসবই করা হয়েছিলো ওয়াকফের ভিত্তিতে এবং ওয়াকফের আয় থেকে। কোনো কোনো মাদরাসা সেকালে আরো অগ্রসর হয়ে খেলার মাঠ, শারিরিক ব্যয়ামের ব্যবস্থা পর্যন্ত করতো। (মুসÍফা সিবাঈ, মিন রওয়াইহাযারাতিনা, পৃ. ২০৫১০৬)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *