‘শোভন সমাজ’-এর আড়ালে অশোভন সমাজের পুনরাবৃত্তি

‘শোভন সমাজ’-এর আড়ালে অশোভন সমাজের পুনরাবৃত্তি

-মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম

শুরু কথা,

বিশ্বব্যাপী চলছে অর্থর্নৈতিক অস্থিরতা। কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বের অর্থনীতি  মহামন্দায়  আবিষ্ট ।  চলমান  অর্থব্যবস্থায় আগে থেকেই ছিল বৈষম্য, দুর্নীতি, অনাচার। কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে সেগুলো কয়েকগুণ বৃদ্ধি হচ্ছে-নিঃসন্দেহে। চলমান অর্থব্যবস্থায় (পূঁজিবাদ ও অন্যান্য)যে মানবতার মুক্তি নেই-এটি একটি ধ্রুবসত্য। শুধু মুসলিম অর্থনীতিবিদগণ-ই নন, অমুসলিম অর্থনীতিবিদগণও বহুবার তা বলেছেন। কোভিড-১৯ এর আগে থেকেই চলমান অর্থব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা উঠেছে। কোভিড-১৯ এর পর এর বিরুদ্ধে আওয়াজ আরও সোচ্চার হচ্ছে-এতে সন্দেহ নেই।

এটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যে, চলমান অর্থব্যবস্থার ব্যর্থতা ও নেতিবাচক ফলাফল দেখে যে কেউ ব্যাথিত হবেন। এর বিকল্প পথ কি হতে পারে-তা চিন্তা করবেন, প্রস্তাবনা দিবেন। এমনটি হওয়াই উচিত। সমস্যা আমাদের, সমাধানও আমাদেরকেই বের করতে হবে। কিন্তু সেই সমাধান বের করতে যেয়ে যদি ঘুরে ফিরে সেই ব্যর্থ অর্থব্যবস্থার বৃত্তেই আটকে যাই, তাহলে সেটি হবে খুবই দুঃখজনক।

সম্প্রতি বামধারার লেখক হিসাবে পরিচিত, সমালোচিত ব্যাংকার আবুল বারাকাত‘শোভন সমাজ’ নামে এমনই এক সমাধানের কথা বলে বেড়াচ্ছেন। লিখেছেন ‘বড় পর্দায় সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র: ভাইরাসের মহা বিপর্যয় থেকে শোভন বাংলাদেশের সন্ধানে’ (সামনে থেকে সংক্ষেপে গ্রন্থটি ‘ভাইরাস’ নামে উল্লেখ হবে)

কমিউনিস্ট ভাবধারার সংগঠন তথাকথিত বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও এ ভাবধারার কিছু মিডিয়া তা বেশ প্রচার করে যাচ্ছে।

বিশ্বের অন্যান্য অর্থনীতিবিদগণ যেখানে প্রচলিত বৃত্তের বাহিরে গিয়ে সমাধান খোঁজতে বলছেন, সেখানে আমাদের দেশের কিছু কমিউনিস্ট নতুন খোলসে পুরাতন চিন্তার কথা বলে বেড়ান!! সামাজতান্ত্রিক পুরনো কথাকে নতুন মোড়কে পেশ করেই নিজেদেরকে তারা ‘অর্থনীতির নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবনকারী’ হিসাবে পরিচিত করতে বেশ তৎপর।

এহেন মুহূর্তে সমীচিন মনে করছি-এ বিষয়ে কলম ধরতে। তাদের তথাকথিত শোভন সমাজের আড়ালে যে অশোভন সমাজের চিত্র আঁকা হয়েছে সেটি জাতির সামনে তুলে ধরতে। বড় অবাক কান্ড, যারা নিজেরাই অশোভন কাজে ধরা খেয়ে ধিকৃত হয়েছেন, তাদের মুখেই আজ শোভন সমাজের কথা শোনা যায়। ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আর কাকে বলে!!

শোভনসমাজ-যা বোঝানো হয়েছে

শোভন সমাজ (Decent social) এর কথা বলার অর্থ, আমরা যে সমাজে আছি-তা শোভন নয়। অশোভন। এ সমাজ লোভ লালসা ভিত্তিক,  ব্যক্তি স্বার্থভিত্তিক ও মুনাফা ভিত্তিক এক সমাজ। যার অপর নাম  ‘পূঁজিবাদ’। এ সিস্টেম টাই অশোভন সিস্টেম। শোভন সমাজের অর্থ এ সিস্টেম থেকে বের হওয়া।  (ভাইরাস, মুখবন্ধ, ০৬)

এতটুকু তে কারও কোনও দ্বিমত নেই। বর্তমান পূঁজিবাদে যে একটি অশোভন ব্যবস্থা-তা স্বীকৃত। পূঁজিবাদ শোভন সমাজের পরিপন্থী-এটি সকলেরই কথা। 

এ থেকে আমাদেরকে উত্তরণ করতে হবে-তাও স্বীকৃত। কিন্তু পশ্চীমা অর্থনীতিতেও এর ভাব শিষ্যদের কাছে সেই অতীত কাল থেকেই এর একমাত্র সমাধান-সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি।

এ কথা কে না জানে,  সমাজাতান্ত্রিক অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে একটি ব্যর্থনীতি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকালে রুশ প্রেসিডেন্ড বরিস য়েলৎসিন (Boris Yeltsin) (১৯৩১-২০০৭ইং) এর এই কথা   প্রসিদ্ধ-‘হায়!  সমাজতান্ত্রিক আকাশ-কুসুম কল্পনা দর্শনের পরখটা যদি রাশিয়ার মত একটি বিশাল দেশে না করে আফ্রিকার কোনো ক্ষুদ্র অঞ্চলে করা হত তাহলে এর ধ্বংসাত্মক পরিণতির কথা জানতে ৭৪ বছর ব্যয় করতে হতোনা’।

চার্লস অ্যান্টনি রেভেন ক্রসল্যান্ড (Charles  Anthony  Raven  Crosland)  যথার্থই মন্তব্য করেছেন- ‘শোষণের সম্ভাবনা এবং পূঁজিবাদের সমস্ত লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্যসমূহ এখানেও   (সমাজতন্ত্রে) পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান’। (the future of socialism)

৮০ এর দশকে তিনি ছিলেন বৃটেনের একজন বিশিষ্ট ও বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবি। সমাজতান্ত্রিক হয়েও তিনি সমাজতন্ত্র নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন- Public ownership was essential to make socialism work.

 

মোটকথা, পূঁজিবাদের অভিশাপ থেকে বের হয়ে সমাজতন্ত্রে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কিন্তু সমস্যা হল- বামপন্থীদের কাছে তো এর বিকল্পও নেই। এই দ্বিবিধ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তারা চতুর তার আশ্রয় নিয়ে সেই সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শকেই মূলভিত্তি রেখে নতুন উপস্থাপনায় আরেকটি ভ্রান্ত চিন্তা  ‘শোভনসমাজব্যবস্থা’ নামে দাঁড় করানোর ব্যর্থ  চেষ্টা করে যাচ্ছে। আদতে যা সেই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপিত, ধিকৃত সমাজতন্ত্রের পুরনো কাসুন্দি বৈ কিছুই নয়। 

তারা বলতে চান- 

শোভন সমাজের প্রথম ধাপ: উত্তরণ (Transition) ও পর্যালোচনা

প্রথমে পূঁজিবাদ হটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে ধারা ছিল,  এখনও সেই ধারা অক্ষুণ্ন রেখে ব্যক্তি মালিকানাধীন পূঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্র কবজায় নিতে হবে। এটি সামাজিক সংগ্রাম বা বিপ্লবের মাধ্যমেও হতে পারে। এর মাধ্যমে সকল পূঁজির মালিকদের হাত থেকে কবজা করা হবে উৎপাদনের সকল উপায়। যথা-কল-কারখানা, যন্ত্রপাতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, পরিবহন-যোগাযোগ, ব্রিজ-হাইওয়ে, বন্দর, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি হবে শোভন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। এতে বলা হয়েছে ‍উত্তরণ (Transition) পর্ব (ভাইরাস, মুখবন্ধ, ধারা: ১০)

এটি সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার বেশ পুরনো কথা ও  পদ্ধতি। ব্যক্তি মালিকানা হঠাও। একচ্ছত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করো। এর জন্য যুদ্ধ,  মারামারি, সংগ্রাম যাই করতে হয়,  করা হবে। 

এভাবে হত্যাকাণ্ড ও বলপূর্বক সম্পদ দখলের মাধ্যমে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শীরা যখন রাষ্ট্রযন্ত্রে বসবে,  তখনকি তারা ফেরেশতা হয়ে যাবেন?

রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে যারা ছিল রেন্ট সিকার-লোটেরার ভূমিকায়, তাদের হাতে কি করে নিরাপদ থাকবে দেশ ও জাতির অগণিত মূল্যবান সম্পদ?

বস্তুত একচ্ছত্র ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মালিক  হয়ে তারা নিজেরাই তখন শোষক ও নিপীড়কে পরিণত হবে। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা আরো বৃদ্ধি পাবে। সমতা ও বৈষম্য দূর করার জন্য সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। যারা মানুষকে নির্বিচারে হত্যা ও বলপূর্বক সম্পদ ও রাষ্ট্র দখলে বিশ্বাসী,  প্রকৃত রাষ্ট্রীয় জঙ্গিবাদ চিন্তা লালন করে, তাদের থেকে আর যাই হোক মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ, সাম্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

নিম্নের তথ্য গুলো থেকে এ সত্য প্রতিভাত হয়ে উঠে- 

১৯৩০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান নেতা হিসাবে খ্যাত জোসেফ স্তালিন নিজের ক্ষমতা শক্ত করবার জন্য যে নিপীড়ন শুরু করেছিল, তা আজও ইতিহাসের কালো অধ্যায় হয়ে আছে। কমিউনিস্ট পার্টির শত্রু সন্দেহে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।সাইবেরিয়ামধ্য এশিয়ার শ্রম শিবিরে নির্বাসিত করা হয়। রাশিয়ার অনেক জাতিগোষ্ঠীকে তাদের বসতবাড়ি থেকে উৎখাত করে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই গণহত্যায় ঠিক কতজন মারা গিয়েছিলো তা বলা না-গেলেও ধারণা করা হয়,  তাদের সংখ্যা ২০ মিলিয়নের বেশি ছিলো। (জোসেফ স্তালিন-মুক্তি বিশ্বকোষ দ্র.)

অনুরূপ ভাবে চীনের কমিউনিস্টরা যখন ১৯৪৯ সালে ক্ষমতায় আসে তখন পরবর্তী দশক গুলোতে প্রায় ৪৫ থেকে ৭০ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। বিভিন্নভাবে এই হত্যাকাণ্ডে সংগঠিত হয়েছিলো।

মোটকথা, প্রকৃত জঙ্গিপনার মাধ্যমে রাষ্ট্র দখল করে সাম্যতা প্রতিষ্ঠা-এক অলিক কল্প কাহিনী বৈ কিছুই নয়। ঐতিহাসিকভাবে এসব কথা একেবারেই ভুয়া ও অসত্য। পুরনো গাল-গল্পকে নতুন মোড়কে পেশ করার অপচেষ্টা মাত্র!

আমরা বলতে চাই,  যারা এরকম জোর পূর্বক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে,  রাষ্ট্রের উচিত তাদের ব্যাপারে সচেতন থাকা। 

এ হল কথিত ‘শোভন সমাজের’ চিত্রের প্রথম ধাপ, যা সমাজতন্ত্রেরই আরেক ধিৃকত রূপ।

শোভন সমাজের দ্বিতীয় ধাপ: রূপান্তর (Transformation) ও পর্যালোচনা

বিপ্লব ও প্রকৃত জঙ্গিপনার মাধ্যমে যে ক্ষমতা লাভ হবে, সকল উৎপাদন উপায়ে অন্যায় কবজা প্রতিষ্ঠিত হবে, তাতে রূপান্তর (Transformation) ঘটাতে হবে।  অর্থাৎ এতে দ্বিতীয় ধাপে জনগণের গণতান্ত্রিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হবে। যারা প্রত্যক্ষ শ্রমদাতা, উৎপাদক তারাই হবে প্রকৃত পূঁজির মালিক।

সংক্ষেপে বললে, প্রথমে রাষ্ট্র জোর করে, প্রকৃত জঙ্গিপনার মাধ্যমে পূঁজিতে সকল ব্যক্তিগত মালিকানা রহিত করবে। এ হল উত্তরণ ধাপ। এরপর রাষ্ট্র সেটি প্রত্যেক উৎপাদকের হাতে হস্তান্তর করে দিবে। এটি রূপান্তর ধাপ। (ভাইরাস, মুখবন্ধ, ধারা: ১১ অবলম্বনে)

এই রূপান্তর কিভাবে হবে-এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা হয়নি। এর বিস্তারিত রূপরেখার নিঁখুতভাবে বলা সম্ভব হবে ২০৫০ সালের দিকে। (ভাইরাস, মুখবন্ধ, ধারা: ১১)

একটি ধোঁয়াসা রেখে বলা হয়েছে- হতে পারে,কারখানা ও কর্মস্থল পরিচালিত হবে যৌথ মালিকানার সমবায় ভিত্তিতে। কেউ মালিক, কেউ শ্রমিক এমন থাকবে না। সবাই সমান মালিকানায় থেকে কাজ করবে।

প্রথম কথা হল, শোভন সমাজ নামের তথাকথিত যে অর্থনৈতিক চিন্তা দাঁড়া করানো হয়েছে, এর মূল ভিত্তি প্রথম ধাপ, যেটি হুবহু পুরনো সমাজতান্ত্রিত ধাপ। এখানে নতুন কিছু নেই। আর দ্বিতীয় ধাপের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছে, পুরনো সমাজতন্ত্রে যে স্টেট ক্যাপিটালিজম সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি থেকে বের হতে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিশদ কোনও রূপরেখা-ই বলা হয়নি। কি উদ্দেশে বা কারণে একে ২০৫০ সাল পর্যন্ত মওকুফ রাখা হয়েছে-জানা নেই।

তাহলে গবেষণাটি কি হল?৬০০ পৃষ্টা ব্যাপী যে গবেষণা দাঁড় করানো হল- একে শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কি বলা যায়?

গবেষণায় এই অনাচারের দায় কিভাবে এড়াবেন লেখক? পুরনো সমাজতান্ত্রিক অশোভন ও অবাস্তব সমাজ ব্যবস্থাকেই যে তিনি ‘শোভন সমাজের’ আড়ালে চালিয়ে যেতে চেয়েছেন-তা কি বোঝার বাকি আছে? জাতির সাথে এই প্রতারণা করার অধিকার কে তাকে দিয়েছে?

বইটির উপর পর্যালোচনা করতে যেয়ে বিশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শী,  কমিউনিস্ট অধ্যাপক সুমান্ত কুমার দাস এক পর্যায়ে মন্তব্য করেছেন- 

‘এ গ্রন্থে অধ্যাপক বারকাত শোভন রাষ্ট্রের যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলেছেন,  তা অর্জনের দিক দিয়ে মার্ক্সীয় কাঠামোয় যে সব মডেল আছে,  তার সঙ্গে হয়তো পার্থক্য আছে। কিন্তু ধারণার দিক দিয়ে সমাজ তান্ত্রিক ধারণা থেকে একেবারে বিপরীত— সেটি আমার মনে হয়নি। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক ধারণা-কাঠামোর মধ্যেই তিনি অবস্থান করে পুঁজিবাদের বিকল্পের সন্ধান দিয়েছেন।’ -(দৈনিক বনিক বার্তা, আগষ্ট, ২০, ২০২১) 

তিনি আরও বলেছেন-আমি অধ্যাপক বারকাত কে মার্ক্সবাদে বিশ্বাসীদের অনেক বড় বন্ধু বলে মনে করি। 

দ্বিতীয় কথা, এ কথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষকে নির্বিচারে হত্যা ও বলপূর্বক সম্পদ ও রাষ্ট্রদখলের (প্রকৃত জঙ্গিপনা) মাধ্যমে যে সম্পদ ও ক্ষমতা প্রাপ্ত হবে-তা রূপান্তর প্রক্রিয়ায় কখনই যাবে না।

এটি কি বুঝতে গবেষক হতে হবে যে,  গতকাল যে ছিল হত্যাকারী, লোটেরা, সন্ত্রাস, জঙ্গি-সে তথাকথিত ‘শোভন সমাজের’ এমন কি যাদুর ছোঁয়ায় আজ সকল লোভ, লালসা থেকে ঊর্ধে উঠে গিয়ে ফেরেশতা হয়ে সকল সম্পদে ‘রূপান্তর’ প্রক্রিয়া ঘটাবে? যে রূপান্তর প্রক্রিয়া কোনও বিশদ রূপরেখাই নেই এখন পর্যন্ত।

প্রখ্যাত লেখক ডিকোস্টা তার ‘রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতি’ গ্রন্থের ৬৮ নং পৃ. উল্লেখ করেছেন- রাশিয়ার মোট আয়ের অর্ধেক শতকরা ১১ বা ১২ জন উচ্চ পর্যায়ের লোকদের পকেটস্থ হত। আর অবশিষ্ট অর্ধেক শতকরা ৮৮ জনের মাঝে ভাগহত। 

বড় আশ্চর্যের বিষয়,  এই  সকল  তথাকথিত কমিউনিস্ট লোক গুলি, একদিকে মানুষের প্রতি অনাস্থা প্রদর্শন করে। কাউকে তার ব্যবসায়,  সম্পদে মালিকানা প্রদান করে তার থেকে সামাজিক স্বার্থ লাভ হবেনা বলে মনে করে,  তারাই আবার সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশভাবে একদলীয় রাষ্ট্রের কতিপয় শাসকবর্গের উপর বিশ্বাস করে বসে!! 

শোষণের যে আশঙ্কায় যে ব্যক্তি মালিকানায় বিশ্বাস করা হয়নি, সেই একই ব্যক্তিকে উত্তরণের পর বিশ্বাস করে নেয়া হয়, সে নিজের স্বার্থ দ্বারা প্রণোদিত না হয়ে সকলের স্বার্থে কাজ করবে!!

এসব শাসকবর্গ তো মূলত তারাই যাদের ব্যক্তিমালিকানা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। তারা তো ভিন্ন কিছু নয়। ব্যক্তিমালিক বা পূঁজিপতিদের তুলনায় তারা তো দেবদূত নয়। যদি তাই হয়ে থাকে,  তবে সকল উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে তাদের হাতে যে বিপুল ক্ষমতা পূঞ্জিভূত হয় সে ক্ষমতা যে তারা ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করবেনা এর নিশ্চয়তা কোথায়!! 

ফলাফল দাঁড়াচ্ছে এই,  পূঁজিবাদে অগণিত পূঁজিপতি কর্তৃক অর্থনৈতিক শোষণ হত। আর সমাজতন্ত্রে  রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কতিপয় শাসকগোষ্ঠি কর্তৃক অর্থনৈতিক শোষণ হয়। এজন্যই বলা হয়-সমাজতন্ত্র মূলত পূঁজিবাদেরই ভিন্ন এক রূপ। আর সেই রূপকেই এখন কথিত ‘শোভন সমাজের’ নামে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে মাত্র।

তৃতীয়, রূপান্ত প্রক্রিয়া কি আদৌ কোনও শোভন সমাজ বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবে? একটি কারখানায় মালিক ও শ্রমিক কোনও তফাৎ থাকবে না। ধরা যাক-জুতোর কারখানা। রূপান্তর প্রক্রিয়ার আগে সেখানে ৫০ জন শ্রমিক রাত-দিন পরিশ্রম করে কাজ করতো। রূপান্তর প্রক্রিয়ায় এসে সেই শ্রমিকগণ নিজেদেরকে কারখানা মালিকের মতোই সমান মালিক জ্ঞান করবে। তাহলে কাজটি করবে কে এখন?

মালিক না হওয়ার কারণে যারা পারিশ্রমিকের আশায় কাজ করে যেতো, জীবন নির্বাহ করতো, এখন মালিক হয়েও তারা আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কাজ করবে, আর এতে শোভন সমাজ নির্মাণ হয়ে যাবে-এমন অলিক, অবাস্তব স্বপ্ন যারা দেখে, তাদেরকে সুস্থ মানুষ বলা যাবে কি না-মানসিক চিকিৎসকগণ ভালো বলতে পারবেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসকি তাদের জানা নেই, এক সময়ে বিশ্বের বৃহৎ খাদ্যশস্য রপ্তানীকারক দেশটি সমাজতন্ত্রের কবলে পড়ে পরিণত হয়েছিল বৃহৎ খাদ্য আমদানীকারকের দেশে!( Marshal I. Goldman, U.S.S.R. in CRISIS: The Failure of an Economic System (1983), P.2)

পুরনো সমাজতন্ত্রে সকল মালিকানা রাষ্ট্র ধরে রেখেছিল। আর তাদের রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে-মালিকানা দিয়ে দিতে হবে। এই মালিকানা দেয়াই যেখানে প্রমাণিত নয়, সেখানে মালিকানা কিভাবে দেয়া হবে? আর দেয়া হলেও, মজুর শ্রমিককে সমান মালিক বানিয়ে দেয়া হলে তা কি আদৌ বাস্তবভিত্তিক হবে?

এ তো স্পষ্ট সাংঘর্ষিক চিন্তা।  একটি কারখানায় মালিক থাকবে, শ্রমিকও থাকবে। আবার বলা হবে, শ্রমিকও সমান মালিকানা রাখে। যদি তাই হয়, তাহলে কাজের জন্য তৃতীয় কাউকে নিয়োগ দিতে হবে। তৃতীয় যে আসবে, সেও মালিক হয়ে যাবে। তাহলে কাজ করবে কে? এই তথাকথিত শোভন সমাজ এর কথা যারা বলছে, তারা কি তখন কাজ করবে? না কি অন্য গ্রহ থেকে এলিয়েন নিয়ে আসতে হবে? এরকম সস্তা কথা বলে কিভাবে তারা গবেষক সেজে যান-সেটিই বড় আশ্চর্যের বিষয়!

শোভন সমাজের অশোভন চিত্রের আরও কিছু দিক

কথিত শোভন সমাজের চিত্রে-দেশে  কোনও প্রকার প্রাইভেট ওনারশিপ থাকবেনা। মানুষ্য সৃষ্ট সকল উপৎপাদন উপায়ের মালিক হবে জনগণ। জনগণের পক্ষে রাষ্ট্র থাকবে। রাষ্ট্র ও সমবায় যৌথ মালিকানা। (ভাইরাস, মুখবন্ধ, ধারা: ১২)

এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে-রূপান্তর প্রক্রিয়ায় আসলে রাষ্ট্রেরও মালিকানা থাকবে। যদি তাই হয়,  তাহলে তো সেটি হুবহু পুরনোধিকৃত সমাজতন্ত্রেরই আরেক রূপ। শুধু উপস্থাপনের পার্থক্য।  বাস্তবে নয়। আগে বলা হতো রাষ্ট্র সরাসরি সব কিছুর মালিক হয়ে যাবে। আর এখন বলা হল-জনগণ মালিক হবে, তাবে তার পক্ষে রাষ্ট্র তা ধারণ করবে। ঘুরে ফিরে সেই একই কথা হল।

Private ownership উঠিয়ে দেয়ার ভয়াবহ কুফল-বিশ্ব বহু আগেই জেনে নিয়েছে। ব্যক্তিগত মুনাফা, মালিকানা ধারণা না থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনই অগ্রসর হয় না। মানুষ যখন দেখবে ‘হাড়ভাঙ্গা খাটুনি’ ও ‘ফাঁকিবাজি’ সমানভাবে মূল্যায়িত হয়, তখন কিসের তাড়নায় কাজ করে যাবে? সমাজতান্ত্রিক এসব বস্তাপঁচা নীতিকথা এখনও আধুনিক বিশ্বে বামপন্থীরা কিভাবে চিন্তা করে-তা ভেবে কুল পাই না।

তারা আরও বলেছে-এ সমাজে কোনও ব্যাংক থাকবে না (থাকবে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক)। থাকবে না শেয়ার বাজার। বিলুপ্ত হবে শ্রম ধারণা। (ভাইরাস, মুখবন্ধ, ধারা ১২)

এভাবে একটি দেশের অর্থনীতি কিভাবে চলবে, রাষ্ট্র তার ঋণ কিভাবে পাবে, জনগণ ব্যবসার মূলধন কিভাবে লাভ করবে-ইত্যাদি বিস্তর কোনও পরিকল্পনাই বলা হয়নি। এ ধরনের চিন্তা যে স্বাধীন বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করবে না-এর কি নিশ্চয়তা আছে?

বাংলাদেশ যেখানে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে আছে-বিশ্বের বুকে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার দাঁড়প্রান্তে-ঠিক এ সময়ে কাদের ক্রিড়নকে পরিণত হয়ে, স্বাধীন দেশে থেকেও এই বামপন্থীরা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে? গবেষণার নামে কু-গবেষণা করে দেশকে আরও পিছিয়ে দিতে ষড়যন্ত্র করে-সরকার পক্ষের তা খতিয়ে দেখা উচিত মনে করি।

শোভন সমাজের আড়ালে অশোভন সমাজের চিত্র এখানেই শেষ নয়। তারা এই কথিত শোভন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধান প্রতিবন্ধক হিসাবে বিবেচনা করে থাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ধর্ম, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষের ধর্ম-ইসলাম ও ইসলামপন্থীদেরকে। এক জায়গায় লেখা হয়েছে-‘বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে শোভন সমাজ বিনির্মাণের খুবই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ’। (পৃ.64) বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা উগ্র রূপ ধারণ করেছে। (পৃ.৬৫)

অপরদিকে তথাকথিত শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে প্রগতিবাদী তরুণ প্রজন্মের আলোকিত আন্দোলন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (পৃ.৬৫)

নাস্তিক,মুরতাদরা যখন ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করে, হিংসা ছড়ায়, দেশে গোলযোগ তৈরি করে, তখন সেটি হয় আলোকিত আন্দোলন। আর এর বিরোধিতা করা হলে সেটিই হয়ে যায় অন্ধকারচ্ছন্ন আন্দোলণ। বাক স্বাধীনতার নামে কেউ আপনাকে গালি দিবে, আপনি প্রতিবাদ করতে গেলেই আপনি হয়ে উঠবেন সাম্প্রদায়িক!

কথিত শোভন সমাজের এমন মাণদণ্ডে যারা বিশ্বাসী, তাদের কাছ থেকে আর যাই হোক-শোভন সমাজ অকল্পনীয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় তারা কখনও গেলে, কি পরিমাণ গোলযোগ ও বিশৃংখলা তৈরি করবে-তা এসব চিত্র থেকেই বোঝা যায়। বিপ্লব ও প্রকৃত জঙ্গিপনায় যারা বিশ্বাসী-তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে আর বেশি কিছু আশা করা যায় না।

কথিত গবেষণায়-নানা স্থানে হিংসা, প্রতিহিংসা, উৎসে দেয়া, বিশৃংখলা তৈরির নানা উপাদান ছড়িয়ে আছে। আর এসব করেও সরকারের আনুকুল্য লাভের জন্য তোষামোদের ভুরি ভুরি উদাহরণ তাতে পাওয়া যাবে। এক স্থানে কোনও প্রকার তথ্য-প্রমাণ, রেফারেন্স ছাড়া লেখা হয়েছে-‘বঙ্গবন্ধু‘শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়েছিলেন তাদের হোতা ছিলেন জিয়াউর রহমান’। (পৃ.68)

এ ধরনের কথাবার্তা সমাজে কতোটা বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারে-বিজ্ঞ পাঠক আশা করি তা উপলব্ধি করতে পারছেন। এরকম একটি গ্রন্থ কিভাবে গবেষণার মর্যাদা পায়-তা ভেবে কুল পাই না।

‘শোভন সমাজের’ ফেরিওয়ালা নিজে কতটুকু ‘শোভন’?

গত ২০২০ এর শেষের দিকে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি আলোচনায় উঠে আসে। এ সময় দৃশ্যমান হিসাব-পত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা। (বেসরকারী হিসাবে তা ৩ লক্ষ কোটি টাকার বেশি তখন) মোটা অংকের এই খেলাপি ঋণের ৮৫ শতাংশই মাত্র ২৫টি ব্যাংকের।

এর মধ্যে শীর্ষ ৫টি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের মাঝে জনতা ব্যাংক ছিল সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ সৃষ্টিকারী। শীর্ষ ১০০ খেলাপির এক চতুর্থাংশ সৃষ্টির জন্য দায়ি ছিল এই জনতা ব্যাংক। এর সিংহভাগ খেলাপি গ্রাহক ছিল পূর্ব থেকে সমালোচিত মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান।

ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স। এ দুটি গ্রুপের কাছেই ছিল ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ। আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু প্রকল্প ব্যয়ের এক তৃতীয়াংশ! (প্রথম হিসাব মতে)

এই গল্প উল্লেখের পেছনে মূল কারণ-জনতা ব্যাংকের এই ব্যাংকিং দুর্নীতি  ও কেলেঙ্কারীর শুরুটা হয় কথিত গবেষক আবুল বারাকাত এর সময়কাল থেকে। তিনি তখন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে ছিলেন।

এ সময়ে জনতা ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা। ৫ফেব্রুয়ারী, ২০১৮, তারিখে ‘বারকাতই ব্যাংকটি শেষ করে দিয়েছেন: অর্থমন্ত্রী’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ প্রতিবেদন প্রকাশ করে পত্রিকাটি। তাতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সাহেব মন্তব্য করেছেন-‘জনতা ব্যাংক এক সময় সেরা ব্যাংক ছিল। কিন্তু আবুল বারকাতই ব্যাংকটি শেষ করে দিয়েছেন।’ 

আরেক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেছেন- ‘আবুল বারকাত (জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান)  এত টাকা দিয়েছেন,  আমি তো জানিইনা। আমি জানি যে তাঁর সময়ে বড় বড় বেনামি ঋণ দেওয়া হয়েছে। ৩০০কোটি, ৪০০কোটি টাকা এবং খারাপ উদাহরণও তৈরি হয়েছে।’ (উৎস: প্রাগুক্ত)

সরকারী ব্যাংক হিসাবে এক সময়ের শীর্ষ ব্যাংক জনতা ব্যাংকের এই দুর্দশার জন্য যারা দায়ি ছিলেন, বিশেষত বারাকাত সাহেব-তাদের তদন্ত হয়েছিল কি না, এর পেছনে বিশাল কি পরিমাণ অর্থের গোপন লেনদেন হয়েছে, ব্যাংক কেন্দ্রিক আরও কি কি লেলেঙ্কারির সাথে তিনি জড়িত ছিলেন-এসব বিষয় নিয়ে দু:খজনকভাবে পরবর্তীতে কোনও সংবাদ পাওয়া যায়নি।

আমরা মনে করি, দেশের স্বার্থে এ কেলেঙ্কারির সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত। এতে এই শোভন সমাজের ফেরিওয়ালাদের আসচরিত্র জাতির সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে। তারা আসলে কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে তাও জানা যাবে।

ঐ সময় জাগো নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম এভাবে একটি নিউজ করে  ‘জনতা ব্যাংক ইস্যু এড়িয়ে যাচ্ছেন আবুল বারকাত’ ।  (তারিখ: ৬ফেব্রুয়ারী, ২০১৮) তাতে উল্লেখ করা হয়-

‘এনন টেক্স নামের এক প্রতিষ্ঠানকে পাঁচহাজার ৪০৪ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। নিয়ম ভেঙে এক গ্রাহককেই মাত্র ছয় বছরে এ ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি। আর এ কেলেঙ্কারির শুরু ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপকড. আবুল বারকাতের সময়ে।

আবুল বারকাত ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে দুই মেয়াদে পাঁচ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। সে সময়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ পান এনন টেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউনুস (বাদল)। তার মূল ব্যবসা বস্ত্র উৎপাদন ও পোশাক রফতানি।

তাই ব্যাংক পাড়ায় আলোচিত নতুন ভাবে জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি মূল ব্যক্তি আবুল বারকাত। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে অনেকটা নিশ্চুপ তিনি। এড়িয়ে যাচ্ছেন ইস্যুটি। নানা কৌশলে আড়াল করছেন নিজেকে।’ 

সংবাদে এরপর উল্লেখ করা হয়েছে,  সাংবাদিক নানা ভাবে এই ইস্যূতে তার সাথে কথা বলতে চেয়েছেন কিন্তু তিনি বরাবরের মতো বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। 

আমাদের বক্তব্য হল-যে ব্যক্তি নিজেই দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত। ঋণখেলাপি সৃষ্টির মাধ্যমে কালো টাকা তৈরিতে জড়িত,  সেইলোক-ই আবার কিভাবে শোভন সমাজের কথা বলে? কেউ কেউ বলেন,  কমিউনিস্টদের লজ্জা-শরম থাকতে নেই। 

সমাধানের সঠিক পথ: সার সংক্ষেপ

পূঁজিবাদ ও অন্যান্য মাবরচিত অর্থব্যবস্থা  কোনওটিই মানব কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারছে না। পদে পদে ব্যর্থ হয়েছে। এহেন মুহূর্তে পৃথিবী তাকিয়ে আছে নতুন এক অর্থনীতির দিকে। ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের চেয়ারম্যান প্রচলিত যাবতীয় অর্থনীতির প্রতি চরম অনাস্থা প্রকাশ করে যথার্থ মন্তব্য করেছেন- 

“Today we have reached a tipping point, which leaves us with only one choice: change or face the continued decline and misery.” (Causes and remedies of the present financial crisis from an Islamic perspective, by Mufti Muhammad Taqi Usmani. P.32.)

এহেন মুহূর্তে আমাদেরকে একটি টেকসই ও ভারসাম্য অর্থনীতি খুঁজতে হবে। যেখানে ব্যক্তি মালিকানা থাকবে,  তবে পূঁজিবাদের মতো স্বেচ্চাচারিতা থাকবেনা। মুজর-মালিক থাকবে,  তবে যুলুম থাকবেনা। বৈষম্য থাকবেনা। বৈষম্য তৈরি করে এমন সকল উপাদান (সুদ,  জুআ,  ঋণের ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি)  নিষিদ্ধ থাকবে। পরোপকার,  কল্যাণকামিতা,  নৈতিকতা থাকবে যার মূল চলক হিসাবে। বৈষম্য নিরসনের জন্য বাধ্যতামূলক নানা আয়োজন থাকবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা- এমন নীতি ও নিয়ম সমৃদ্ধ টেকসই ও ভারসাম্য অর্থনীতির কথা কেবল ইসলামে বলা আছে। এ অর্থব্যবস্থার আলোকে অত্যন্ত সুষ্ঠু ভাবে হাজার বছর নানা ভু-খণ্ড পরিচালিত হয়েছে। এর সফল ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। সুতরাং পৃথিবীকে অর্থনৈতিক তাবৎ সমস্যা থেকে মুক্ত করতে হলে ইসলামের টেকসই অর্থনীতি গ্রহণের বিকল্প নেই। এটিই চরম ও চিরসত্য। আজ হোক কাল হোক পৃথিবী তা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। এটি গ্রহণের মাধ্যমেই মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলেই অর্থনৈতিক কল্যাণ ও সুখভোগ করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *