ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে শরিয়া পরিপালনের নীতিমালা

 

ইসলামের এটি একটি স্বাতন্ত্র্য ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, তাতে রয়েছে মানব জীবনের পূর্ণাঙ্গ বিধি-বিধান। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক—প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি অঙ্গনে, প্রতিটি পদক্ষেপের ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। যা মূলত মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যেই মানবজাতির সৃষ্টি কর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে প্রদত্ত হয়েছে। 

মানব জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ আর্থিক লেনদেন মুআমালা, ব্যবসার ক্ষেত্রটিও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। এ ব্যাপারেও রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা, যা পরিপালন করা হলে আখেরাতের সাথে সাথে পার্থিব জীবনেও মানবজাতির বহুমুখী কল্যাণ নিশ্চিত হতো।

 

ইসলাম শুধুমাত্র কিছু আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব কোন ধর্ম বা মতবাদের নাম নয়। বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এতে রয়েছে জীবন চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা। একজন মুসলিম জীবন চলার পথে যে অঙ্গনগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হয়, সেই অঙ্গন সম্পৃক্ত শরীয়াহ জানা ইসলাম তার ওপর আবশ্যক করেছে।

এ প্রসঙ্গে এসেছে

 :  ينبغي للرجل أن لا يشتغل بالتجارة ما لم يعلم أحكام البيع والشراء؛ ما يجوز وما لا يجوز

“কোন ব্যক্তির জন্য ক্রয়-বিক্রয়ের বিধিবিধানগুলো জানার আগে ব্যবসায় জড়িত হওয়া উচিত নয়”(ফাতাওয়া হিন্দিয়া:৫/৪২০).

 

: لا يحل لأحد أن يشتغل لأقل من التجارة ما لم يحفظ كتاب البيوع، 

“কোন ব্যক্তির জন্য লেনদেন সংক্রান্ত অধ্যায়ের মাসআলাগুলো আত্মস্থ করার আগে ছোটখাটো ব্যবসা করাও বৈধ নয়”(ফতোয়া বাযযাযিয়াহ:১১/৯)

বিখ্যাত মনীষী ইমাম গাযযালী রাহিমাহুল্লাহ তার বিখ্যাত গ্রন্থ এহইয়ায়ে উলুমুদ্দীনে  এ লিখেছেন:

“কোন এলাকায় যদি সুদি ও অবৈধ লেনদেন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেখানে অবস্থানকারী মুসলিম ব্যবসায়ীর জন্য সুদ থেকে বেঁচে থাকার জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। এটি সেই জ্ঞান যা অর্জন করা ফরজ করা হয়েছে।”(এহইয়ায়ে উলুমুদ্দীনে ১/৩৩)

 

নিম্নে আমরা বাংলাদেশে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে শরিয়াহ পরিপালনের কিছু নীতিমালা নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব। শিরোনামটি একটি বৃহৎ কলেবরে বিশদ আকারে আলোচনার দাবি রাখে, বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিমালার দিকে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

 

ব্যবসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্রতম একটি পেশা। আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে ব্যবসা করেছেন। ব্যবসার পণ্য নিয়ে মক্কা থেকে সুদূর সিরিয়া পর্যন্ত সফর করেছেন। সাথে সাথে বিভিন্ন বক্তব্যে ব্যবসায়ীদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কারণ একজন ব্যবসায়ী ব্যবসার মাধ্যমে শুধুমাত্র নিজের জীবিকার ব্যবস্থা করে না, বরং বহু মানুষের জীবন-জীবিকাকে সহজলভ্য করে ,তাদের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তাদের হাতে পৌঁছার ব্যবস্থা করে দেয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন:

“একজন সত্যবাদী বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী (আখেরাতে)নবী, সিদ্দিক ,শহীদদের সাথে থাকবে।”(জামে তিরমিযী:১২০৯) তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

বলাবাহুল্য এই বিশাল মর্যাদার অধিকারী কেবল ঐ সকল ব্যবসায়ীরাই হতে পারবে যারা শরিয়া নীতিমালার আলোকে ব্যবসায় পরিচালনা করবেন। হাদিসে ব্যবসায়ের বৈশিষ্ট্য হিসেবে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত শব্দটি যুক্ত হয়ে ওই বিষয়ের প্রতিই ইশারা করছে।

একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান শরিয়াহর আলোকে পরিচালিত হওয়ার জন্য নানামুখী উদ্যোগ ও নানা শ্রেণি থেকে সহযোগিতার প্রয়োজন। এর মধ্যে অন্যতম হলো

 

,শরীয়াহর আলোকে বিস্তারিত গাইড লাইন প্রণয়ন করা কিংবা প্রতিষ্ঠান শরিয়ার আলোকে পরিচালিত হবে এমন রেজুলেশন প্রস্তুত করা।

২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতার একটি তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ।

আর আরজেএসসি (Registrar of Joint Stock Companies And Firms)এর ২০২০ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে নিবন্ধিত জয়েন্ট স্টক কোম্পানির সংখ্যা রয়েছে প্রায় দেড় লক্ষ। শতকরা প্রায় ৯০ পার্সেন্ট মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ মালিকানায় রয়েছে মুসলিম ব্যক্তিগণ। তাই এই প্রতিষ্ঠানগুলো সুশৃংখলভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য যেমন সাধারণ নীতিমালা রয়েছে, ঠিক একইভাবে শরীয়ার আলোকে পরিচালিত হওয়ার জন্য এগুলোর বিস্তারিত নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। যা সম্ভব হলে আখেরাতের সওয়াবের পাশাপাশি পার্থিব জীবনেও ব্যবসার ক্ষেত্রে আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা পাবে। এবং মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকলেই এর সুফল ভোগ করবে।

উল্লেখ্য, এই উদ্যোগে দুটো পক্ষকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে। 

ক, রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ। যারা সামগ্রিকভাবে সকল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে শরিয়ার মৌলিক নীতিমালা গুলো যেন সুরক্ষিত থাকে এবং নিষিদ্ধ রিবা, কিমার, গারার যেন যুক্ত না হয় এই বিষয়ক নীতিমালা ও নির্দেশনা জারি করবে।

খ, শরিয়া সুপারভাইজারি বোর্ড।প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিযুক্ত এসএসবি বিশেষ ভাবে ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমগুলো শরীয়ার আলোকে  বাস্তবায়নের জন্য যথারীতি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এর জন্য কোম্পানির প্রতিষ্ঠা লগ্নেই এভাবে রেজুলেশন করে নেয়া যেতে পারে যে কোম্পানি শরিয়া অনুযায়ী পরিচালিত হবে এবং শরিয়া বিষয়ে শরিয়া নীতিমালা এবং এসএসবির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

 

,শরীয়া বোর্ড/শরিয়া পরামর্শক নিয়োগ দান

ফিকহুল মুয়ামালাতে দক্ষ ইসলামিক স্কলারদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা। তাদেরকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিয়ে শরীয়াহ পরিপালনের জন্য অবাধ পরামর্শের সুযোগ  দান এবং সেগুলো যথাযথ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।

আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান গুলোর জন্য শরিয়া পরামর্শক নিয়োগ দান করা। আমাদের পূর্ববর্তী মণিষীগণ এই বিষয়টির ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করতেন। এ বিষয়ে উল্লেখ হয়েছে:  وكان التجار في القديم إذا سافروا استصحبوا معهم فقيها يرجعون إليه في أمورهم، وعن أئمة خوارزم أنه: لا بد للتاجر من فقيه صديق اهـ   

“পূর্বের জামানায় ব্যবসায়ীগণ সফরের সময় একজন ফকিহ সাথে নিয়ে যেতেন। যেন প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীক শরিয়া জেনে নিতে পারেন। খাওয়ারিজমের ইমামগণ বলেছেন প্রত্যেক ব্যবসায়ীর জন্য একজন ফকিহ থাকা আবশ্যক।” (ফতোয়া বাযযাযিয়াহ:১১/৯)

আলহামদুলিল্লাহ, এখন দেশে শরিয়া কনসালটেন্সি ফার্ম রয়েছে। তাদের মাধ্যমেও এই কাজগুলো আরো নিখুঁত ভাবে,আরো আস্থার সাথে আদায় করে নেয়া যেতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনকে সামনে রেখেই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এ ধরনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএফএ কনসালটেন্সি লিমিটেড ২০১৫ থেকে কার্যক্রম শুরু করে। একটি প্রতিষ্ঠানে শরিয়া পরিপালন নিশ্চিত হওয়ার জন্য নানা পর্যায়ের কার্যক্রম যেমন চুক্তিপত্র শরিয়ার আলোকে সঠিকভাবে প্রস্তুতকরণ, শরিয়া ডকুমেন্টেশন, শরিয়া চেকিং, শরিয়া অডিট, শরিয়া রিভিউ ইত্যাদি সব বিষয়েই সাবস্ক্রিপশন মডিউলে কিংবা কেস টু কেস মডিউলে  অত্যন্ত সুনামের সাথে প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অনেককেই সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

 

৩, অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শরিয়া অডিট নিশ্চিতকরন

অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শরিয়াহ অডিটের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাচাই করা।

একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান শরিয়ার আলোকে পরিচালিত হওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠার সময় কেবল শরিয়া নীতিমালা প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়, বরং সময়ে সময়ে সেই নীতিমালাগুলো যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা তদারকি করাও জরুরি। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। একাউন্টিং এর জন্য আমরা যেমন বছর বছর অডিট হওয়াকে জরুরী মনে করি, ঠিক তেমনি শরিয়া পরিপালন নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ধারাবাহিক আভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শরিয়া চেকিং জরুরি। 

 

, শরিয়া বিষয়ে জ্ঞানকে সমৃদ্ধকরণ

প্রতিষ্ঠানের কর্মীদেরকে নানামুখী প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে শারিয়াহ বিষয়ে দক্ষ ও আন্তরিক করে গড়ে তোলা।

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। শরিয়া বিষয়ে তাদের জানার পরিধি যত মজবুত হবে, সেই প্রতিষ্ঠানে শরীয়া পরিপালনের বিষয়টি ততবেশি নিশ্চিত করা সম্ভব। অতএব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদেরকে নিয়মিত লেনদেন বিষয়ক শরিয়া এবং প্রতিষ্ঠানের প্রোডাক্টগুলোর শরিয়া মেকানিজম ও ফ্রেমওয়ার্ক সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

এ বিষয়ে খলিফাতুল মুসলিমিন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, আমাদের বাজারে ব্যবসা করতে পারবে সেই যে দীন(লেনদেন বিষয়ে শরিয়া নির্দেশনাগুলো) শিখেছে (জামে তিরমিজি: ৪৮৭)

অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, আমাদের বাজারে ব্যবসা করতে পারবে সেই, যে দীন শিখেছে ।অন্যথায় ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সে সুদে জড়িয়ে পড়বে।

এর জন্য নিয়মতান্ত্রিক ভাবে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে শরীয়া বিষয়ে ট্রেনিং প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করা, ডায়লগ সেশন করা, দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করা ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহন করা বাঞ্ছনীয়।

 

৫, ব্যবসায়িক কার্যক্রমগুলোতে শরিয়াহ নির্দেশিত শর্তসমূহ নিশ্চিত করা।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য মৌলিকভাবে দুটি কাজ আঞ্জাম দিতে হয়।

উভয় ক্ষেত্রেই  ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা দিয়েছে। 

১.পুঁজি সংগ্রহ 

ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান পুঁজি সংগ্রহের জন্য শরীয়াহসম্মত কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। যেমন: 

ক. মুদারাবা : মুদারাবা হলো, একটি অংশীদারিত্বমূলক  ব্যবসা , যার মধ্যে একপক্ষ পুঁজি সরবরাহ করে, অপরপক্ষ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার কাজ আঞ্জাম দেয় । যা লাভ হয় তা উভয়ের মাঝে চুক্তিসম্মত হারে বণ্টন হয়। তবে লােকসান হলে তা কেবল পুঁজিদাতা বহন করে। মুদারিবের শ্রম বিফলে যায় । 

 খ. মুশারাকা, 

মুশারাকা হলো, একটি যৌথ ব্যবসা, যাতে সকল অংশীদার পুঁজি, শ্রম বা দায় গ্রহণের ক্ষেত্রে শরীক থাকে । 

 

গ. সুকুক ইস্যু করা:

বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ফান্ড সংগ্রহের জন্য সুকুক ইস্যু করতে পারে। সুকুক একটি সংবেদনশীল প্রোডাক্ট। যার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট শরিয়া ফ্রেমওয়ার্ক।  একটি সুকুক প্রোডাক্টে একাধিক শরিয়া কন্ট্রাক্টের শরণাপন্ন হতে হয়। যে কোন সুকুক শরিয়া কমপ্লায়েন্স হওয়ার জন্য তাতে থাকা সকল কন্ট্রাক্ট এর শর্তসমূহ ও আবেদনগুলো পূর্ণ করা আবশ্যক। বলাবাহুল্য তা নিশ্চিত করার জন্য শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত শরিয়া তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ এর কোন বিকল্প নেই।

 

২. বিনিয়োগ: 

ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগের জন্য শরীয়াহ সম্মত কিছু বিনিয়োগ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারে।

যেমন ১. মুদারাবা ২. মুশারাকা ৩.মুরাবাহা ৪.বাইয়ে মুয়াজ্জাল ৫.বাইয়ে সালাম ইত্যাদি 

এগুলোর প্রত্যেকটির নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য ও শর্ত রয়েছে। সেগুলো লক্ষ্য রেখে বিনিয়োগ করতে হবে। যার জন্য প্রয়োজন বিস্তারিত গাইড লাইন, নিয়মিত শরিয়া তদারকি এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নিরীক্ষণ।

 

৬, কোড অফ ইথিকস পরিপালন নিশ্চিতকরন

প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা পরিপালনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা।

ইসলামী  বিধানগুলো বাস্তবায়নের পেছনে অন্যতম একটি লক্ষ্য হলো আদল ও ইহসান প্রতিষ্ঠা করা। অন্যান্য শাখা-প্রশাখার মত লেনদেনের ক্ষেত্রেও  ইসলাম এর প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছে। এর জন্য লেনদেনের ক্ষেত্রেও ইসলাম প্রদান করেছে নীতি-নৈতিকতার পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তৃত বিধান। বিষয়টির অত্যধিক গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদীসে বলেছেন:”ব্যবসায়ীরা কেয়ামতের দিন পাপী হয়ে উঠবে তবে তারা ছাড়া, যারা আল্লাহকে ভয় করে, নীতি-নৈতিকতা অবলম্বন করে এবং সত্যবাদিতাকে গ্রহণ করে।(জামে তিরমিযী:১২১০)ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।

হাদিসের গ্রন্থগুলোতে লেনদেন সংক্রান্ত অধ্যায়ে এ বিষয়ে বহু নির্দেশনা রয়েছে। নিচে তার থেকে কিছু বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

(ক) সততা ও পণ্যের বিবরণ স্বচ্ছভাবে প্রদান করা। 

হাদীস শরীফে এসেছে-“ক্রেতা-বিক্রেতা যদি সত্য বলে এবং পণ্যমূল্যের বিবরণ স্বচ্ছভাবে প্রদান করে, তাদের লেনদেনে বরকত দান করা হয়।”(সহীহ মুসলিম:১৫৩২, সহীহ বুখারী:২০৭৯)

 

(খ) আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততা।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন:

“একজন সত্যবাদী বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী (আখেরাতে)নবী, সিদ্দিক ,শহীদদের সাথে থাকবে।”(জামে তিরমিযী:১২০৯) তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

 

(গ) ধোঁকা ও প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকা।

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন এক খাদ্যদ্রব্য ব্যবসায়ীর পাশদিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি পরীক্ষার জন্য খাদ্যদ্রব্যের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন, তার আংগুল মোবারক ভিজে গেছে। (অর্থাৎ ওপরের অংশ শুকনো, কিন্তু ভেতরের অংশে ভেজা) তিনি জিজ্ঞেস করলেন: এই যে খাদ্য ব্যবসায়ী! এটি কি? লোকটি উত্তর দিল: হে আল্লাহর রাসূল! বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। নবীজি তখন বললেন: তাই হয়ে থাকলে দোষযুক্ত অংশটি কেন ওপরে রাখলে না যেন মানুষ তা দেখে ধোকা না খায়? জেনে রাখ যে ধোঁকা প্রদান করে সে আমার দলভুক্ত নয়।( সহীহ মুসলিম:২৯৬)

 

(ঘ) পণ্যের দোষ গোপন না করা।

হযরত জাবের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:

প্রত্যেক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। অতএব কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয় দোষের কথা বলা ছাড়া তার ভাইয়ের কাছে কোনো দোষযুক্ত পণ্য বিক্রি করা। (মুস্তাদরাকে হাকেম: ২/১০)

 

(ঙ) পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণে কম না দেওয়া।

আল্লাহ তায়ালা বলেন: “ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়”(সূরা মুতাফফিফীন: ০১)

 

(চ) ব্যক্তি স্বার্থের উপর জনস্বার্থ কে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করা। তাই এমন পণ্য ও সেবা গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে যেগুলোর প্রতি জনগণের প্রয়োজনীয় চাহিদা বেশি। এবং মানুষের সংকটের মুহূর্তে খাদ্য গুদাম জাদুঘরে রাখা যাবে না।

সাহাবী হযরত মা’মার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সে পাপী।”(সহীহ মুসলিম:৪০৬৯)

 

এ ধরনের আরও বহু বিষয়ের কথা বর্ণিত হয়েছে যে গুলোর প্রতি লক্ষ রাখলে আমরা সবাই উপকৃত হব। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি বাস্তবায়ন করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে মানদণ্ড প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান accounting and auditing organisation for Islamic financial institutions এর প্রস্তুতকৃত code of ethics আমরা অনুসরণ করতে পারি। যা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অত্যন্ত গোছানো ,সুবিন্যাস্ত ও পূর্ণাঙ্গ একটি সংকলন। রেজুলেশন করে এই কোড অফ ইথিকস কে প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

 

এক্ষেত্রে কোড অফ ইথিকস কে শুধুমাত্র গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। বরং তা পরিপালন নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত তদারকি ও অন্যান্য উৎসাহব্যঞ্জক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যেমন

ক, শরিয়া স্কলার্ দিয়ে ডায়লগ সেশন এর ব্যবস্থা করা।

খ, পুরস্কারের ঘোষণা প্রদান করা।

গ, এ বিষয়ক কোরআন হাদিসের বর্ণনা সম্বলিত লিফলেট ব্যানার ক্যালিগ্রাফি ইত্যাদি অফিসে বিদ্যমান রাখা।

ঘ, প্রতিদিনের কার্যক্রম একটি হাদিস পাঠ ও শ্রবণ এর মাধ্যমে শুরু করা ইত্যাদি।

 

আমরা আশাবাদী উপরোক্ত নীতিমালা ও পরামর্শগুলো যদি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দ নিজেদের ও জনগণের পার্থিব কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি “সত্যবাদী বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী…….”এই হাদীসে উল্লিখিত ব্যক্তিদের কাতারে নিজেদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *