প্রাক্কলিত বাজেটে আয় উৎস ও কিছু কথা

 

আব্দুল্লাহ মাসুম

সিএসএএ, অ্যাওফি, বাহরাইন

সিনিয়র সহকারী মুফতি, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা

 

বরাবরের মতো আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রাক্কলিত বাজেটে আয়-উৎসের শীর্ষে রয়েছে কর। বাংলাদেশ সরকারের রাজস্বের ৮৫ শতাংশ কর রাজস্ব। প্রাক্কলিত আয়ের ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এক এনবিআরকেই ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছর থেকে তা ৪০ হাজার কোটি টাকা অধিক লক্ষ্যমাত্রা; অর্থাৎ ১২ শতাংশ বেড়েছে। সহজে বললে, কর আহরণের লক্ষ্যমাত্রা আরও এক দফা বাড়ল।

কর দেবে কারা? কিন্তু দিচ্ছে যারা

প্রতিনিয়ত আমরা কর বাড়িয়ে যাচ্ছি। গড়ে আড়াই-তিন লাখ টাকা বার্ষিক আয় থাকলে আয়কর দিতে হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি যেখানে ৬ শতাংশ বা তার বেশি, সেখানে এভাবে গড়পড়তা টাকার হিসেবে কর ধার্য করা কতটুকু সমীচীন? কর সবাই দেবে কেন? নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কেন কর দেবে? কর দেবে শুধু ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা। এর সঙ্গে যদি Tax evasion হ্রাস করা যায়, কর ব্যবস্থাপনা সুসংগঠিত হয়, সঙ্গে আমাদের প্রস্তাবিত সরকারি আয়-উৎসগুলো যুক্ত হয়, তাহলে সামগ্রিকভাবে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

করের নামে গরিব শোষণের নীতি

আমাদের নীতি হয়ে গেছে, এনবিআর কর উসুল করছে কম; ব্যাস, পরের বাজেটে কর আহরণ মাত্রা বৃদ্ধি করতে হবে। কর ও ভ্যাটের নতুন নতুন স্কোপ খুঁজে বের করতে হবে। কর কেন উসুল হচ্ছে না, ফাঁকি দেওয়া কেন বন্ধ হলো না? তা খতিয়ে দেখার সময় নেই। কর বাড়াও, গরিব শোষণ করো- এমন মানসিকতা লালন করছি আমরা।

জুলুমের আরেক নাম ভ্যাট

ইদানীং কর বৃদ্ধি মানে ভ্যাট বৃদ্ধি হয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরেও কর খাতের মধ্যে ভ্যাট ছিল সর্বোচ্চ শীর্ষ খাত। আগামীতেও তা বহাল থাকবে, বোঝাই যাচ্ছে। নানাভাবে ভ্যাট আরোপ করে মূলত বৃহৎ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। ধরুন, আপনার আয় মাসে ২০ হাজার টাকা; আমার আয় ১ লাখ টাকা। এখন আমরা দু’জনেই একটি পণ্য ক্রয় করলাম। ভ্যাট দিলাম ১ হাজার টাকা। তাহলে এটি হবে আপনার আয়ের ৯ শতাংশ। আর আমার আয়ের মাত্র ১ শতাংশ। অর্থাৎ আপনি আমার চেয়ে ৫ গুণ কম আয় করলেও ভ্যাট দিচ্ছেন আমার সমান। এর মানে হলো, আমার-আপনার মধ্যে আয় বৈষম্য ছিল ৫ গুণ। এ অবস্থায় ভ্যাট সমান সমান দেওয়ায় বৈষম্য আগের চেয়ে বেড়ে গেল।

ভ্যাটের ব্যাপক সংস্কৃতির পক্ষে-বিপক্ষের বক্তব্য

ব্যাপকভাবে এ ভ্যাট-সংস্কৃতি যে বা যারাই প্রচলনের পরামর্শ দিয়েছেন, তারা ভালো কোনো কাজ যে করেননি, তা স্পষ্ট। ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থনীতি সেক্টরের সঙ্গে জড়িত একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিও এর সঙ্গে জড়িত বলে শুনেছি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মনে রাখতে হবে, শাসকগোষ্ঠী, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- এ তিন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভ্যাট বেশ প্রিয়। কারণ, এতে করের ভিত্তি বিস্তৃত হয়। তারা আরও ঋণ দিয়ে ব্যবসা করতে পারবে। কিন্তু শেষতক বৈষম্য বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র জনগণ। উপকৃত হবে গুটিকতক পুঁজিপতি। অর্থনীতির ভাষায় যা ‘ট্রিকল ডাউন থিউরি’ নামে খ্যাত। দেশের নানা অর্থনীতিবিদ এ ধরনের ব্যাপক করকে বর্জনীয় বলে মন্তব্য করেছেন।

তাহলে কি ভ্যাট বা কর ব্যবস্থাপনা থাকবে না?

এসব আলোচনার অর্থ এ নয় যে, কোনো কিছুর ওপর ভ্যাট থাকবে না। ভ্যাট থাকবে, করও থাকবে; তবে সেটি নির্বিচারে বা গণহারে নয়, ভারসাম্য পথে হবে। সেটি কীভাবে হবে, এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সংক্ষেপে শুধু এতটুকু বলা যায়, আমাদের বিকল্প সম্পদ উৎস খুঁজে বের করতে হবে। পাশ্চাত্য ধারায় কর ও ভ্যাটনির্ভর বাজেট থেকে বেরুতে হবে। আমরা জাকাত, ওয়াকফের মতো সুবৃহৎ আয়-খাত তৈরি করতে পারি। অতি মুনাফায় করারোপ করতে পারি। কালো টাকা উদ্ধার ও অর্থ পাচার রোধ করে ও সেখান থেকে উদ্ধারকৃত সম্পদ দিয়ে প্রয়োজন মেটাতে পারি। পাশাপাশি ইসলামি অর্থব্যবস্থা অনুসারে দেশীয় উৎস থেকে প্রকল্প ব্যয় মেটাতে পারি। বৈদেশিক ঋণ হ্রাস করতে পারি। এসব বিষয়ে নানা গবেষণা আছে। সেগুলো শোনা ও আমলে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়া চাই। গতানুগতিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসেও যে চিন্তা করা যেতে পারে, সে সাহসটুকু ধারণ করা উচিত।

 

যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি

আমাদের অর্থনীতিতে এখন কয়েকটি বিষয় বেশ চিন্তার। যথা-

১. আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস হচ্ছে। গত ৮ মাসের ব্যবধানে এ রিজার্ভ ৪৮ মিলিয়ন ডলার থেকে এখন ৪৪-এ নেমেছে। আমদানি যে গতিতে বাড়ছে, রপ্তানি সে তুলনায় কম। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিকতায় পতন পড়েছে। শীর্ষ সরকারি চারটি ব্যাংক এলসি দায় পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরের নয় মাসে বাংলাদেশের আমদানি বিল গত বছরের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। যাকে ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন অনেকে।

আমাদের আমদানি ঘাটতি দাঁড়াতে পারে, আগামী অর্থবছরে এটি মাথায় রাখতে হবে। আমদানি রীতি সংকোচন করতে হবে। নেপাল এরই মধ্যে আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে আমদানি নীতিতে কিছুটা কঠোর হয়েছে। তবে সেটি আরও আগে হওয়া দরকার ছিল। এ ছাড়া এ বিষয়ে আরও কঠোর নীতি প্রণয়ন করা উচিত।

আমদানি ও রপ্তানি খাতে দুর্নীতি হচ্ছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। আমদানি এলসিতে ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে কি-না, রপ্তানি এলসিতে আন্ডার ইনভয়েসিং হচ্ছে কি-না, এগুলো প্রতিহত করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবে, শ্রীলঙ্কা, নেপালের দূরাবস্থায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার অধঃপতন একটি সতর্কীকরণ পয়েন্ট। একে অবহেলা করা যাবে না। সরকারপক্ষের কেউ কেউ বলছেন, ‘শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমাদের এমন হবে না কিছু।’

এ কথাগুলো ঢালাওভাবে বলা উচিত নয়। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে ধসের পেছনে তিনটি কারণ মোটা দাগের দায়ী। যথা- ক. দুর্নীতি, খ. অতি আমদানিনির্ভরতা ও গ. অপরিকল্পিত বৈদেশিক ঋণ। আমাদের দেশের অর্থনীতিতে এ তিনটি খাতই আশঙ্কাজনক পর্যায়ে আছে বলে অনেকে মনে করছেন। মোটকথা, ভয় পাব না, তবে সতর্ক থাকতে হবে। ইনশাআল্লাহ আমাদের কিছু হবে না।

২. ভর্তুকি ও সুদ বাবদ ব্যয়। এ দু’টি ব্যয় দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। শুধু এ দু’টি খাতেই আমাদের বাজেটে ব্যয়ের ৫৭ শতাংশ ব্যয় হবে। নানা ধরনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর মোটা অংকের টাকা সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকি কমাতে বা ভর্তুকি যেন না দিতে হয়, সেদিকে সরকারের অধিক মনোনিবেশ করা উচিত। তা ছাড়া সুদি ঋণ কমিয়ে আনতে ঘাটতি হ্রাস করার বিকল্প নেই। এ পরিস্থিতিতে আমরা বাজেটে ঘাটতি বাড়িয়ে রাখলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। ঠিক আছে, আমাদের যথাসময়ে ঋণ পরিশোধের ভালো ইতিহাস আছে। কিন্তু এটি গর্বের নয়, সতর্ক হতে হবে। পরিস্থিতি কখনও আগে বলে-কয়ে খারাপ হয় না।

আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিমাত্রায়নির্ভরশীল। বর্তমান অর্থবছরের রপ্তানি খাতের ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও তা আমদানির ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও শ্লথ হয়ে গেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা রয়েছে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন।

৩. বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের দিকে যাত্রা করছে। এ মুহূর্তটি বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং সময়। উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হওয়ায় আন্তর্জাতিক নানা সুবিধা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে। বিশেষত, আমাদের রপ্তানি বহুমুখী করতে হবে। শিক্ষায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। দুর্নীতি হ্রাস করতে হবে। কিছুটা কৃচ্ছ্রতা সাধনের মধ্য দিয়ে আমাদের টেস্টিং সময়টি পার করা উচিত। যেন দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনীতি অর্জনে আমরা নিজেদের প্রমাণ করতে পারি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পগুলো বন্ধ করা উচিত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারার্থে সোচ্চার হওয়া জরুরি। কিন্তু আমরা কি তা করতে পারছি? একটার পর একটা মেগা প্রকল্প হাতে নিচ্ছি। দুর্নীতি করছি। এর সঙ্গে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তো আছেই।

সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন ভালো নেই বলে অনেকে মনে করছেন। এখনও সময় আছে, আমাদের মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান রেখে, তাঁর বিধান পরিপালন করে সুদকে বয়কট করে সামগ্রিক অর্থনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে। শরিয়া পরিপন্থি যাবতীয় অর্থনৈতিক লেনদেন থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত অর্থে একটি সুন্দর, টেকসই ও ভারসাম্য অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।