খেলাফতকালের ব্যবসায়ী শুল্ক ও বর্তমান কাস্টমস

মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম

 

ব্যবসা-বাণিজ্যের দুটি ভাগ রয়েছে। যথা- বৈদেশিক বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসা। বৈদেশিক বাণিজ্যের আবার দুটি ভাগ রয়েছে। যথা- ক. আমদানি, খ. রপ্তানি। খোলাফায়ে রাশেদিনের সময়ে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে কর রীতি ছিল না। তদ্রুপ বৈদেশিক বাণিজ্যেও শুরুর দিকে ছিল না। কিন্তু তৎকালীন ইরান ও রোমান সাম্রাজ্যের বিধান ছিল, সেখানে মুসলিম ব্যবসায়ীরা পণ্য নিয়ে গেলে বা নিয়ে এলে তাদের কর দিতে হতো। কিন্তু তাদের ব্যবসায়ীরা মুসলিম রাষ্ট্রে বৈদেশিক বাণিজ্যের উদ্দেশে এলে কর দিতে হতো না। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মুসলিমদের ক্ষতি হতো। সামগ্রিকভাবে তা ইসলামি রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলত। বিষয়টি ওমর (রা.) লক্ষ্য করলেন। তিনি তখন খলিফাতুল মুসলিমিন। মুসলিমণ্ডঅমুসলিম উভয়ের অর্থনৈতিক স্বার্থে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি প্রাদেশিক গভর্নরদের আদেশ করলেন, অমুসলিম ব্যবসায়ীর কাছ থেকে যেন ব্যবসায়ী শুল্ক আদায় করা হয়। পাশাপাশি সমতা বিধানের জন্য মুসলিম ব্যবসায়ীদের থেকেও পণ্যের জাকাত উসুল করার ফরমান জারি করলেন। তদ্রুপ মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম জিম্মি ব্যবসায়ীদের থেকেও আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ী শুল্ক আদায়ের আদেশ করেন। (কিতাবুল খারাজ : ১৩২)।

ওমর (রা.)-এর শুল্ক নীতির ব্যাখ্যা

ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনু সাল্লাম (রহ.) লিখেছেন, ‘ওমর (রা.)-এর নীতি ছিল, তিনি মুসলিমদের থেকে জাকাত গ্রহণ করতেন। আর অমুসলিমদের উশর বা শুল্ক গ্রহণ করতেন। কারণ মুসলিম ব্যবসায়ী যখন তাদের দেশে গমন করত, তখন তারাও মুসলিমদের থেকে এ ধরনের কর গ্রহণ করত। (কিতাবুল আমওয়াল : ৫২৯)। ইমাম শাবি (রহ.) বলেন, ‘ইসলামে সর্বপ্রথম ওমর (রা.) উশরের প্রবর্তন করেছেন। (কিতাবুল আমওয়াল : ১৬৬৭)। মোট কথা, এটি একটি আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় আইন ছিল। অমুসলিমরা যেহেতু শুধু মুসলিমদের থেকে গ্রহণ করত, তাই তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য ইতিহাসের অন্যতম দুরদর্শী রাষ্ট্রপ্রধান ওমর (রা.) অমুসলিমদের ওপর কাস্টমস আরোপ করেন। এ ক্ষেত্রে ইনসাফ বজায় রাখা হয়েছিল। অমুসলিমরা ঠিক যে পরিমাণ গ্রহণ করত, এর বেশি তাদের ব্যবসায়ী থেকে নেওয়া হতো না।

 

যাদের থেকে উশর বা শুল্ক গ্রহণ করা হতো

মোট তিন শ্রেণি থেকে আলোচিত উশর বা কর উসুল করা হতো। যথা- ক. হারবি তথা অমুসলিম রাষ্ট্রের ব্যবসায়ী। খ. জিম্মি তথা মুসলিম রাষ্ট্রের ব্যবসায়ী। গ. মুসলিম ব্যবসায়ী। এটি মূলত কর নয়। প্রকৃত অর্থে পণ্যের জাকাত। পরিভাষায় উক্ত তিন শ্রেণির করকে উশর বলা হয়। (উল্লেখ্য, উশর শব্দটি বহুবচন। একবচন- উশরুন বা উশর। শাব্দিক অর্থ- এক দশমাংশ। ফসলের জাকাতকে উশর বলা হয়। আর অমুসলিম ব্যবসায়ীর শুল্ককে উশুর বলে। দুটি এক নয়। তবে শব্দ দুটির উচ্চারণ কাছাকাছি। রাষ্ট্রের যে কর্মী তা উসুল করে, তাকে ‘আল আশের’ বলে)। বোঝা গেল, খারাজের মতো আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে অমুসলিম ব্যবসায়ীদের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়টি ওমর (রা.) কর্তৃক প্রবর্তিত। বলার অপেক্ষা রাখে না, খোলাফায়ে রাশেদিন কর্তৃক প্রবর্তিত নীতিসমূহও মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুসরণীয়।

 

মুসলিম দেশের অমুসলিম ব্যবসায়ী থেকে কর উসুলের কারণ

অমুসলিম দেশ থেকে আগত অমুসলিম ব্যবসায়ী থেকে ডিউটি গ্রহণের বিষয়টি যৌক্তিক, যা একটু আগে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; কিন্তু মুসলিম দেশে অবস্থানকারী অমুসলিম জিম্মি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী থেকে কর উসুলের কারণ কী? এ ব্যাপারে সালাফ থেকে দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে। যথা- এক. জাহেলি যুগ থেকেই জিম্মিদের থেকেও এ ধরনের ডিউটি গ্রহণ করা হতো। সেটিই বহাল রাখা হয়েছে। এটি ইমাম জুহরি (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। দুই. জিম্মিদের সঙ্গে ওমর (রা.) মূলত সমঝোতা করে নিয়েছিলেন যে, তারা মুসলিমদের দেশে থাকবে, বিনিময়ে মাথাপিছু কর প্রদান করবে, ট্যাক্স দেবে। সঙ্গে তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীগণ উশুরও প্রদান করবে। এ ব্যাখ্যাটি ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনু সাল্লাম (রহ.) গ্রহণ করেছেন। এর আগে ইমাম মালেক (রহ.)-ও এমন ব্যাখ্যা করেছেন। ব্যাখ্যাদুটির মাঝে তুলনা করতে গিয়ে ইমাম আবু উবাইদ (রহ.) লিখেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে সমঝোতার যে ব্যাখ্যাটি আমরা করেছি, সেটিই ওমর (রা.)-এর সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ ও অগ্রগণ্য। ইমাম মালেক (রহ.)-ও এমনটি বলতেন।’ (কিতাবুল আমওয়াল : ৫৩২)।

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে কর বা শুল্কব্যবস্থা

অমুসলিম ব্যবসায়ী বা জিম্মি ব্যবসায়ী থেকে উশুর নেওয়ার বিধানটি ছিল ওমর (রা.)-এর ইজতিহাদ। সাহাবিরা এতে একমত হয়েছিলেন। পাশাপাশি এটি ছিল একটি সাময়িক পরিস্থিতিনির্ভর বিধান। এখন যেহেতু শুধু মুসলিম থেকে ডিউটি নেওয়া হয় না; বরং সব দেশে সব আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী থেকেই নেওয়া হয়, তাই এখন আর মুসলিম দেশগুলোর জন্য (খেলাফত যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবুও) আলাদা করে শুধু অমুসলিমদের থেকে ডিউটি নেওয়ার বিধান বাকি থাকবে না। তা ছাড়া এখন অমুসলিম দেশেও মুসলিমরা বসবাস করেন। সুতরাং বর্তমানে এমন আইন করা হলে, তা সেসব মুসলিমের জন্য পীড়াদায়ক হতে পারে। আর জিম্মি তো এখন নেই। খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্বোক্ত কারণে জিম্মিদের থেকে এমন কর নেওয়া যাবে না। এটি মূলত এমন বিধান, যা পরিস্থিতি ও পরিবেশের বদলে পরিবর্তিত হচ্ছে।

 

শুল্কের পরিমাণ

যে পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করা হবে, সেই পণ্যের মূল্যমানের ওপর ভিত্তি করে কর আরোপ হবে। এ ক্ষেত্রে মুসলিম-অমুসলিমের মাঝে পার্থক্য করা হয়েছে। তবে সবার ক্ষেত্রে নীতি ছিল, জাকাতের নেসাবের মতো সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ- এ দুটির যে কোনো একটির মূল্যের চেয়ে কম মূল্যের পণ্যের ওপর কোনো শুল্ক আরোপ হবে না। উক্ত মূল্যমানের হলে অমুসলিম হারবির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে, অমুসলিম জিম্মির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে, মুসলিমের ক্ষেত্রে জাকাত হিসেবে ২.৫ শতাংশ আদায় করতে হবে। বাহ্যত মনে হতে পারে, মুসলিমদের থেকে এত কম কর নেওয়া হলো কেন? প্রথমত, মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটি কর নয়, বরং এটি তাদের সম্পদের জাকাত। এ জন্য নেসাব পূর্ণ না হলে তাকে এ ক্ষেত্রেও এর জাকাত দিতে হয় না। আবার সম্পদ বেশি হলে জাকাতের পরিমাণও বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, মুসলিমকে অন্যান্য সম্পদেরও জাকাত দিতে হয়; যা অমুসলিমদের দিতে হয় না। সুতরাং এতে বৈষম্য নেই। তা ছাড়া এটি এ জন্য নেওয়া হচ্ছে যে, মুসলিম ব্যবসায়ী থেকে তারা নিয়ে থাকে। যদি তারা নেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে অমুসলিমদের থেকে নেওয়া বন্ধ করতে অসুবিধা নেই।

 

শুল্ক আদায়ে কমবেশ করা যাবে?

উক্ত হার কমবেশি করা যেতে পারে। যে পণ্যের প্রয়োজন বেশি হবে, সে পণ্যের কর হ্রাস করা যেতে পারে। ওমর (রা.) তার সময়ে যেসব অমুসলিম ব্যবসায়ী বহির্দেশ থেকে তেল ও গম নিয়ে আসত, তাদের কর হার ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, তখন ইসলামি রাজধানীর তেল ও গমের প্রয়োজন ছিল। অথচ স্বাভাবিক অবস্থায় অমুসলিম ব্যবসায়ীদের কর হার ১০ শতাংশ। (কিতাবুল আমওয়াল : ৫৩৩)। বোঝা গেল, উক্ত করারোপে কমবেশি করা যাবে। তবে জুলুম যেন না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

প্রচলিত কাস্টসম বা ডিউটি ও ওমর (রা.) কর্তৃক প্রবর্তিত ব্যবসায়ী শুল্ক

প্রচলিত রাজস্ব নীতি অনুযায়ী, বিভিন্নভাবে কাস্টমস বা ডিউটি বা শুল্ক আরোপ করা হয়। আমাদের দেশে দুই পদ্ধতিতে আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক আদায় করা হয়- এক. আমদানি-রপ্তানি চালানের মূল্যের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট হারে শুল্ক আদায় করা হয়। এটিই অধিক হয়ে থাকে। দুই. কিছু পণ্যে (যেমন- মদ) পরিমাণভিত্তিক শুল্ক আদায় করা হয়। আমদানির ক্ষেত্রে পণ্য ভেদে শুল্ক হার কমবেশি হয়। কখনও শূন্য শুল্কও থাকে। দেশের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যে শূন্য শুল্ক থাকে। যেমন- কৃষিখাতের প্রধান উপকরণসমূহ তথা সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি শূন্য শুল্ক হারে আমদানি করা যায়। কখনও দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে শুল্কের হার বাড়ানো হয়। যেমন- আগে পেঁয়াজ আমদানিতে শুল্ক ছিল না। এতে দেশীয় পেঁয়াজ উৎপাদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। ফলে এখন পেঁয়াজ আমদানিতে কিছু শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আবার কখনও শূন্য শুল্ক না করে রেয়াতি শুল্ক আরোপ করা হয়। অর্থাৎ কিছুটা ছাড় দিয়ে কম শুল্ক আরোপ করা হয়। এমনও হয়, আমদানি নিরুৎসাহিত করতে আমদানি কর বাড়ানো হয়। যেমন- সিগারেট আমদানি, অ্যালকোহল আমদানিতে অনেক কর দিতে হয়। আমাদের দেশে রপ্তানিকে উৎসাহিত করা হয়। তাই এ খাতে শুল্কের পরিমাণ খুবই কম।

 

শুল্ক বা উশুর ও বর্তমান কাস্টমস বা ডিউটি এক নয়

কেউ কেউ মনে করেন, প্রচলিত কাস্টমস বা ডিউটি সর্বপ্রথম ওমর (রা.) চালু করেছেন। বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়। ওমর (রা.) কর্তৃক প্রবর্তিত শুল্ক বা উশুর ও বর্তমান কাস্টমস বা ডিউটি এক নয়। প্রথমত, উশুর মুসলিমদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জাকাত হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু প্রচলিত কর জাকাত নয়। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত শুল্ক শুধু অমুসলিমদের থেকে নেওয়া হতো। এদিকে প্রচলিত ব্যবসায়িক শুল্ক মুসলিমণ্ডঅমুসলিম সব ব্যবসায়ী থেকে গ্রহণ করা হয়। তৃতীয়ত, উশুর ধার্য হওয়ার একটি নেসাব ছিল। কিন্তু প্রচলিত কাস্টমস ডিউটিতে এ ধরনের কোনো নেসাব নেই। মোটকথা, কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত কাস্টমস বা ডিউটির সঙ্গে উশুর মিল থাকলেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত কাস্টমস বা ডিউটির মূল প্রবর্তক ওমর (রা.) বলা ঠিক নয়।

 

বর্তমান ইসলামি বিশ্বে উশুরের চর্চা

বর্তমান ইসলামি বিশ্বের কোথাও উশুরের চর্চা নেই। এর স্থানে প্রচলিত আমদানি-রপ্তানি শুল্ক ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে ইসলামের করনীতি প্রযোজ্য হবে। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কথা হলো, বৈদেশিক বাণিজ্যে শুল্কের ক্ষেত্রে ইনসাফের সঙ্গে রাষ্ট্রের বৃহৎ কল্যাণকে নিশ্চিত করতে করের প্রয়োগ হতে পারে। আর তা হলো- ১. দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে কিছু কিছু পণ্যে কর আরোপ করা। যেমন- পেঁয়াজের ক্ষেত্রে করা হয়েছে। ২. প্রয়োজনীয়, বিলাসী বা ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার হ্রাস করতে কর আরোপ করা যেতে পারে। যেমন- তামাকজাত পণ্যে অধিক কর আরোপ করা। চলতি বাজেটে এমনটি করা হয়েছে। এটি ভালো দিক। এগুলো রাষ্ট্রের বৃহৎ কল্যাণকে নিশ্চিত করার অন্তর্ভুক্ত। ৩. প্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক হ্রাস করা। যেমন- চিকিৎসাসংক্রান্ত পণ্য। এ ছাড়া ব্যাপকভাবে সব আমদানিতে একটি ন্যূনতম শুল্ক থাকতে পারে। কারণ, এখন আগের মতো শুধু অমুসলিম আমদানিকারক থেকে শুল্ক নেওয়ার বিধান জারি করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের সঙ্গে এটি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ ক্ষেত্রে উক্ত করকে বন্দর ব্যবহারের বিনিময়ে গ্রহণ করা যেতে পারে।

লেখক : সিএসএএ, অ্যাওফি, বাহরাইন

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আইএফএ কনসালটেন্সি লি.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *