খেলাপি ঋণ প্রতিরোধে করণীয়

ইউসুফ সুলতান

সিএসএএ, অ্যাওফি, বাহরাইন
সহ-প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আইএফএ কনসালটেন্সি লিমিটেড

ইসলামি অর্থনীতিতে খেলাপি ঋণ মূলত মৌলিক কোনো সমস্যা নয়; বরং ঋণ খেলাপি তৈরির সুযোগ কম। আগেকার মুসলিম খেলাফতের সময়কালে খেলাপি ঋণ মৌলিক কোনো সমস্যা হিসেবে কখনোই দেখা যায়নি। কারণ, ইসলামি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ব্যবস্থায় ঋণ বিনিয়োগ পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত নয়; বরং এর মৌলিক বিনিয়োগপদ্ধতি হলো, মোশারাকা ও মোদারাবা। অবশ্য মোরাবাহা বা ক্রয়-বিক্রয়ভিত্তিক কিছু বিনিয়োগ পদ্ধতিও আছে। সেগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের। তা ছাড়া সেখানে কনভেনশনাল ব্যাংকিংয়ের মতো খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এতে বাস্তব ক্রয়-বিক্রয় হয়। ঋণগ্রহীতা ক্রয়কৃত পণ্য নিয়ে ব্যবসা করার সম্ভাবনা অধিক। এখানে নগদ টাকা না থাকায়, সেটি যথেচ্ছ ব্যবহারের সুযোগ ক্ষীণ।

এ জন্যই দেখা গেছে, বাংলাদেশ কনভেনশনাল ব্যাংকিংয়ে যেখানে খেলাপি ঋণ বৃহৎ গর্ত তৈরি করে রেখেছে, সেখানে ইসলামি ব্যাংকিং খুব কম এ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। শীর্ষ দশ খেলাপি সমস্যায় জর্জরিত ব্যাংকের মধ্যে ইসলামি ব্যাংক নবম। এর ওপর প্রচলিত খেলাপি ঋণ প্রতিরোধে ইসলামি অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে মৌলিক কর্মপন্থা রয়েছে। একে দু’ভাগে ভাগ করা যায়-

প্রথম কর্মপন্থা : ব্যাপক কর্মসূচি

এর অধীনে যা করা যেতে পারে-

১. শিল্পের জন্য আলাদা স্বতন্ত্র ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি খেলাপি হয়েছে শিল্পঋণে। যে ব্যাংকগুলো এ খেলাপির শিকার, সেগুলো মূলত স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ব্যাংক। কিন্তু ঋণ দেওয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প খাতে। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর দেশে শিল্পের জন্য বিশেষ দু’টি ব্যাংক ছিল- বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) ও বাংলাদেশ শিল্পঋণ সংস্থা (বিএসআরএস)। কিন্তু পরবর্তীতে এ দু’টিকে এক করে তৈরি হলো, বাংলাদেশ ভেডেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিডেট (বিডিবিএল) নামে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এভাবে বর্তমানে সব বাণিজ্যিক ব্যাংক (বিশেষত সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক) পরিণত হয়েছে বিপজ্জনক শিল্প-ব্যাংকে। পরিণতিতে তৈরি হচ্ছে শিল্প খেলাপি ঋণ। খেসারত দিতে হচ্ছে অগণিত স্বল্পমেয়াদি আমানত গ্রহীতাদের। সুতরাং শিল্পের জন্য স¦তন্ত্র শিল্প-ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা উচিত। সাধারণ মানুষের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংককে নিরাপদ রাখা চাই।

২. সর্বত্র সুদমুক্ত অর্থনীতি গড়ে তোলা। কারণ, খেলাপি সমস্যাসহ তাবৎ অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে অন্যতম কারণ হলো, সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা।

৩. ইসলামের অর্থনীতি, বিনিয়োগনীতি, অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৈতিকতার জ্ঞানচর্চা স্কুল-কলেজ সর্বত্র বাধ্যতামূলক করা। এতে ইসলামের নৈতিকতাবোধ তৈরি হবে। সুদমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে। গড়ে উঠবে একটি টেকসই কল্যাণমুখী অর্থব্যবস্থা।

৪. গণসচেতনতা তৈরি করা। এর মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করার ভয়াবহতা তুলে ধরা বিশেষভাবে বিবেচ্য। এ ক্ষেত্রে সমাজের আলেম শ্রেণিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তা হলো, ‘নিশ্চয়ই দেহের ভেতর একটি গোশতপি- আছে। সেটি সুস্থ হলে পুরো দেহ সুস্থ হয়। আর সেটি নষ্ট হলে পুরো দেহ নষ্ট হয়। গোশতপি-টি হলো অন্তর।’ (বোখারি : ৫২)। এ হাদিস থেকে ইসলামের অমোঘ দু’টি নীতি প্রমাণিত; যথা- এক. সংস্কার গোড়া থেকে করা ইসলামের শিক্ষা। সুতরাং ব্যাধিগ্রস্ত কোনো সমাজের দেহে সাময়িক কোনো ট্রিটমেন্ট কার্যকরী হলেও তা দেহকে মূল থেকে সুস্থ করবে না। দুই. সমস্যা উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে শাখাগত বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার চেয়ে তার মূল ও উৎস অনুসন্ধান করা অধিক জরুরি। বর্তমান সময়ে এ সত্য ও অমোঘনীতি থেকে বঞ্চিত সমাজব্যবস্থার পরিণতি সব ক্ষেত্রের ন্যায় অর্থব্যবস্থায়ও প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। সমাধান তাহলে কোন পথে? সে পথটি খুবই সরল ও সোজা। তা হলো, ইসলামের পথ। সর্বত্র ইসলামি অর্থনীতি ও ইসলামের অন্যান্য মৌলিক বিধান প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। পাশাপাশি প্রতিটি ইসলামি ব্যাংক ও ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অ্যাওফির স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল শরিয়া অডিট জোরদার করা চাই। প্রতিটি ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য শরিয়া এক্সপার্ট বোর্ড বাধ্যতামূলক ও রেগুলটরি বোর্ডের সমপর্যায়ে উন্নীত করা আবশ্যক।

দ্বিতীয় কর্মপন্থা : খেলাপিদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি

এর অধীনে যা করা যেতে পারে-

১. ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা।

২. খেলাপিদের ফাসেক হিসেবে সাব্যস্ত করা। সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহদের মতে, ইচ্ছেকৃত টালবাহানাকারী হিসেবে প্রমাণিত হলে খেলাপি ফাসেক সাব্যস্ত হবে। সুতরাং তার সাক্ষ্যদান-ক্ষমতা রহিত করা হবে। বিশ্বস্ততাকেও রহিত করা যাবে। এতে কোনো মামলা-মোকাদ্দমা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে তার সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষমতা খর্ব হবে।

৩. বিচারক কর্তৃক সম্পদ জব্দ করা। বিচারক তার অন্য কোনো সম্পদ থেকে ঋণ পরিমাণ সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দিতে পারবেন।

৪. ‘তাজির’ তথা শাস্তি আরোপ করা। ইচ্ছাকৃত খেলাপি প্রমাণিত হলে, আদালত তাকে শাস্তির মুখোমুখি করতে পারেন। এর জন্য বিশেষ ট্রাইবুনাল থাকা উচিত। যেখানে এসব বিষয়ের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। ঋণখেলাপি প্রতিরোধের জন্য এটি একটি সর্বোত্তম ব্যবস্থা।

৫. মামলা সংক্রান্ত খরচের দায় আরোপ করা। পাওনাদারের মামলাকরণ থেকে শুরু করে পাওনা উসুল করার জন্য প্রচেষ্টার যাবতীয় খরচ তার দায়ে চাপানো যাবে।

৬. জীবনমান সংকীর্ণ করা। খেলাপিকে তার হালাল অতিরিক্ত সুবিধাদি বিচারক কর্তৃক বাতিল করা যাবে। সুতরাং খেলাপি ব্যক্তিকে কোনো উন্নত মানের খাবার, হোটেল সুবিধা, গাড়ি ব্যবহার, ভিআইপি সুবিধা, বিদেশ ভ্রমণ সুবিধাসহ আরও বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার রায় দিতে পারবেন।

৭. কারাবন্দি করা। ইচ্ছেকৃত খেলাপি ব্যক্তিকে প্রমাণের ভিত্তিতে কারাবন্দি করা যাবে।

৮. খেলাপির সম্পত্তি বিক্রি করা। বিচারক খেলাপি ব্যক্তির যে কোনো সম্পদ বিক্রয়ের নির্দেশ দিতে পারেন। যার মাধ্যমে তার দেনা পরিশোধ করার ব্যবস্থা করা হবে।

৯. ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের কালো তালিকা প্রণয়ন করে সব গণজমায়েতে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। যেমন- রেলস্টেশন, বিমানবন্দর ইত্যাদি।

১০. খেলাপিদের নিয়ে আলাদা করে বৈঠক করা। আলেমদের মাধ্যমে তাদের বিশেষভাবে ঋণ পরিশোধ না করার ভয়াবহতা বিষয়ে অবগত করানো।

এ ছাড়া টিআইবি যেসব কর্মপন্থা বলেছে, সেগুলোও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তাদের উল্লেখযোগ্য পরামর্শগুলো ছিল এমন-

ক. ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ ও ব্যাপক অনিয়মে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য এ খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন করতে হবে।

খ. ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ৪৬ ও ৪৭ ধারা সংশোধন করে বাংলাদেশ ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে।

গ. বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য, গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত নীতিমালা করতে হবে; যেখানে নিয়োগ অনুসন্ধান কমিটির গঠন, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং নিয়োগ-প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকবে।

ঘ. বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে তিনজন সরকারি কর্মকর্তার স্থলে বেসরকারি প্রতিনিধির (সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, যেমন- আর্থিক খাত ও সুশাসনবিষয়ক) সংখ্যা বাড়াতে হবে।

ঙ. ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট আইনগুলোতে আমানতকারীর স্বার্থ পরিপন্থি ও ব্যাংকিং খাতে পরিবারতন্ত্র কায়েমে সহায়ক সব ধারা সংশোধন বা বাতিল করতে হবে। (যেমন- একই পরিবারের পরিচালক সংখ্যা, পরিচালকের মেয়াদ, পর্ষদের মোট সদস্য সংখ্যা হ্রাস করা ইত্যাদি)।

চ. রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে একটি প্যানেল তৈরি এবং সেখান থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগের বিধান করতে হবে। রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাংক পরিচালক হওয়া থেকে বিরত রাখার বিধান এবং ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি নজরদারির মাধ্যমে অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ছ. আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশনিং রাখার বিধান প্রণয়ন করতে হবে।

জ. বারবার পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করে বারবার খেলাপি হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে।

ঝ. ব্যাংক পরিদর্শনের সংখ্যা ও সময়কাল বাড়াতে হবে; প্রত্যক্ষভাবে পরিদর্শন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভাগসমূহের শূন্য পদসমূহ অবিলম্বে পূরণ করতে হবে; পরিদর্শন প্রতিবেদন যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সমাপ্ত ও এর সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সীমিত হলেও পরিদর্শনে তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা পরিদর্শন দলকে দিতে হবে।

ঞ. তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি ও বাস্তবায়নে সংঘটিত অনিয়মণ্ডদুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রকাশ থাকে যে, এসব পরামর্শ চলমান খেলাপি ঋণ প্রতিরোধে করণীয় বিষয়। তবে স্থায়ীভাবে খেলাপি ঋণ প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইসলামি অর্থনীতির দিকেই। এর কোনো বিকল্প নেই।

সারকথা

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। পুঁজিবাদ এমন একটি ব্যবস্থা, যা মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও অধিকার খর্ব করে; গুটিকতক মানুষের হাতে সম্পদের পাহাড় তৈরি করে। অর্থনৈতিক বৈষ্যম চরম আকার ধারণ করে। আজ সর্বত্র অর্থনৈতিক বৈষম্য দৃশ্যমান। বাংলাদেশে প্রতি বছর আশঙ্কাজনকভাবে কোটিপতিদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ১৪ তম।

পুঁজিবাদের আরেক করুণ পরিণতি আজকের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ। গুটিকতক খেলাপিদের হাতে আটকে আছে কোটি কোটি টাকা। এদের অধিকাংশই ইচ্ছেকৃত খেলাপি। বিদ্যমান আইন ও নীতি সবই তাদের পক্ষে সহনীয় পর্যায়ে করা হচ্ছে। এটি পুঁজিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানে রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে প্রকৃত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই বিদ্যমান বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় সুদমুক্ত টেকসই অর্থব্যবস্থা তথা ইসলামি অর্থনীতি গড়ে তোলা। পাশাপাশি বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় আইনি কাঠামো প্রস্তুত করে যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *