কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় ইসলামি দৃষ্টিকোণ

মুফতি লুকমান হাসান

কবরস্থান কী?

আল্লাহতায়ালা মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। মাটিতেই আবার তাকে ফিরিয়ে নেন। সুরা আবাসার ২১নং আয়াতে তিনি মানুষকে মৃত্যুর পর কবর দিতে আদেশ করেছেন। আয়াতটির ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা মানুষকে কবরস্থ করার ব্যবস্থা দিয়ে তাকে সম্মানিত করেছেন। পশু-পাখি বা অন্য প্রাণীর মতো মৃত্যুর পর যেখানে-সেখানে ফেলে রাখার অনুমতি দেননি। কারণ তাতে সে হিংহ্র পশু-পাখি ও পোকামাকড়ের খাদ্যে পরিণত হবে।’ তাই সম্মানজনকভাবে মাটির কাছে মানুষকে সোপর্দ করার যে ব্যবস্থা আল্লাহতায়ালা দিয়েছেন, তা-ই মূলত কবর। কবরস্থান অর্থ সমাধিক্ষেত্র বা গোরস্থান। ওয়াকফকৃত যে ভূমিতে তিন বা ততোধিক কবর রয়েছে, তাকে মাকবারা বা কবরস্থান বলা হয়। (আল ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহ : ১/৮১৭)।

 

কবরস্থানের জন্য ওয়াকফ

আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন অনেক কবরস্থান রয়েছে। ওয়াকফকৃত কবরস্থানের সংখ্যাও কম নয়। কবরস্থানের জন্য জমি দান স্থায়ীভাবে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব লাভে এবং মানবসেবা করার একটি উত্তম মাধ্যম। উক্ত উদ্দেশে জমি ওয়াকফ করলে এবং তাতে কবর দেওয়া আরম্ভ হলে সে জমি কবরস্থান হিসেবে ওয়াকফ হয়ে যায়। (আহকামুল মাকাবির : ৪৪৫)। ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এবং সর্বপ্রথম কবরস্থান হলো, জান্নাতুল বাকি। মসজিদে নববির দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত এ কবরস্থানটি রাসুল (সা.) স্থাপন করেছেন। আনসারি সাহাবি আসআদ ইবনে যুরারা (রা.) এবং মুহাজির সাহাবি উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-কে এ কবরস্থানে প্রথম দাফন করা হয়। বর্তমানে ১০ হাজার সাহাবিসহ অসংখ্য বিশিষ্ট মানুষের কবর রয়েছে সেখানে।

 

ওয়াকফকৃত কবরস্থান সবার জন্য

কবরস্থানের জন্য ওয়াকফকৃত জমি সকল মুসলমানের জন্য উন্মুক্ত। সুতরাং তাতে কবর দেওয়ার জন্য কোনো ফি বা চাঁদা নির্ধারণ করা বৈধ নয়। (আহকামুল মাকাবির : ৪৪৮)। ওয়াকফ হওয়ার পর কবরস্থান অন্যান্য ওয়াকফের মতো একটি আইনগত স্বত্বাসম্পন্ন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। যার রয়েছে নিজস্ব মালিকানা স্বত্ব ও দায়-দায়িত্ব। যার পক্ষে মোতাওয়াল্লি বা কমিটি দায়িত্বশীল হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার যাবতীয় বিষয় আঞ্জাম দেবে। ওয়াকফকারীর বৈধ শর্তাবলি বাস্তবায়ন করা, কবরস্থানের উদ্দেশ্য পূর্ণ করা ও আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করাও তাদের অন্যতম দায়িত্ব।

 

মাজার নির্মাণ, সংস্কার, ওরস ইত্যাদির জন্য ওয়াকফ করা

মাজারের জন্য দান করা বা ওয়াকফ করা বৈধ নয়। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে মাজার দানের কোনো খাত নয়। বিশেষত তাতে ভবন বা ইমারত নির্মাণ করা বা মোমবাতি, আগরবাতি, সুগন্ধি, আলোকসজ্জা, ওরস, গিলাফ ইত্যাদির জন্য দান করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অপচয়। তবে কবর খনন, সংস্কার, সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনে কবরস্থানে দান করা যাবে। (প্রাগুক্ত : ৪৫১)। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো কবরের উদ্দেশ্যে ওয়াকফ করলে বা দান করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। উক্ত সম্পদ জনকল্যাণে ব্যয় করা হবে। কারণ ওয়াকফ ও দান শুদ্ধ হওয়ার জন্য জরুরি হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যের জন্য হতে হবে।’ (প্রাগুক্ত)।

 

কবরের জন্য জমি ক্রয় করা

জীবদ্দশায় কবরের জন্য অনেকে জমি কিনে রাখতে পছন্দ করেন। এটি বৈধ। (আল ফিকহুল ইসলামি ও আদিল্লাতুহ : ২/৪৭০)। একইভাবে মৃত্যুর পর ওয়ারিশরা দাফনের জন্য জমি কিনে তাতে দাফন করতে পারবেন। তবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোনো ওয়ারিশ থাকলে বা কোনো ওয়ারিশের অসম্মতি থাকলে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে তা ক্রয় করা যাবে না।

 

ওয়াকফকৃত গোরস্থানে প্লট ক্রয়-বিক্রয় করা

ওয়াকফকৃত কবরস্থানের কোনো অংশ ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। ওমর (রা.)-কে রাসুল (সা.) ওয়াকফ করার পরমার্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ওয়াকফকৃত বস্তু বিক্রি করা যাবে না, হেবা করা যাবে না এবং তাতে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না।’ (বোখারি : ২৭৬৪)। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কবরের প্লট ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু ওয়াকফকৃত কবরস্থানের কোনো অংশ বিক্রি করা বৈধ নয়।

 

কবর বরাদ্দ রাখা

বিভিন্ন মেয়াদে কবর সংরক্ষণের অধিকার ও ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলন রয়েছে। যেমন ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন কবরস্থানগুলোতে অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কবর সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও স্থান প্রাপ্যতা সাপেক্ষে এসব কবরস্থানে বিভিন্ন মেয়াদে কবর সংরক্ষণের সীমিত ব্যবস্থা রয়েছে। সংরক্ষণের নির্ধারিত ফি পরিশোধপূর্বক ১৫-২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করা যায়। প্রথমত. কবরস্থানগুলো ওয়াকফকৃত কি-না, তা আরও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত. ওয়াকফকৃত না হলেও শুধু কবর সংরক্ষণের নিরাপত্তা প্রদানের প্রচলিত পদ্ধতি সঠিক নয়। কারণ নিরাপত্তা প্রদান না করার অর্থ হলো, কিছুদিন পর প্রয়োজন হলে সেখানে নতুন কবর দেওয়া হবে। এতে আগের কবরে সমাধিস্থ লাশের গলিত অংশ বের করে জমা করে রাখা হয়।

 

লাশ বের করে ফেলার বিধান

এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। মানুষকে আল্লাহতায়ালা সম্মানিত করেছেন। মৃত্যুর পরও তার অসম্মান হয়, এমন আচরণ নিষিদ্ধ করেছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ কবরের ওপর বসার চেয়ে অনেক ভালো যে, সে জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর বসবে। আর তার গায়ের জামা ও শরীরের চামড়া ঝলসে যাবে।’ (মুসলিম : ৯৭১)। মৃতের অসম্মানের আশঙ্কায় কবরের ওপর বসতে যেখানে বারণ করা হয়েছে, সেখানে কবর থেকে লাশ বের করে ফেলে দেওয়া কতটা গর্হিত অন্যায়, তা সহজে অনুমান করা যায়।

 

কবর সংস্থান না হলে করণীয় কী?

লাশ মাটি হওয়া পর্যন্ত তার কবর সংরক্ষণ করতে হবে। আর একটি লাশ মাটিতে পরিণত হতে অন্তত ২০-২৫ বছর সময় লাগে। (ফতোয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ : ১৬৯৬৮৪)। শরিয়ত অনুমোদিত কারণ ছাড়া কবর খুঁড়ে লাশ বের করা জায়েজ নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমান ঢাকা শহরের বাসিন্দার অনুপাতে যে পরিমাণ স্থান কবরের জন্য রাখা দরকার, তার সিকি ভাগও নেই। এমতাবস্থায়, প্রতিদিনই প্রায় আগের কবরে নতুন কবর দেওয়া হচ্ছে। আর আগের কবর থেকে লাশের তাজা-কাঁচা অংশও বেরুলে তা কোনো গর্তে বা ডোবায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এটি অত্যন্ত অন্যায়। এ অন্যায় থেকে বাঁচার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা চিন্তা করতে হবে। সংস্থান বৃদ্ধির জন্য নতুন করে পরিকল্পিত কবরস্থান তৈরি করতে হবে। (এমদাদুল আহকাম : ৩/২৮৭)। যে কবরগুলো অন্তত ২০ বছরের পুরোনো, যার ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত যে, লাশ মাটি হয়ে গেছে, সেখানে নতুন কবর দিতে হবে। (ফতোয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ : ১৬২৮০৪)। একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে এক কবরে একাধিক লাশ দাফন করার সুযোগও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে একই দিনে দাফন করতে হবে, এমন একাধিক লাশ এক কবরে নিয়ম অনুযায়ী শায়িত করা যাবে। (আল ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহ : ২/৪৬৪ ও ৪৬৮)।

 

কবরস্থানের জন্য ব্যয় নির্বাহ

কবরের জন্য অনিবার্য কিছু ব্যয় রয়েছে। যেমন কবর দেওয়ার জন্য মাটি উপযোগী করা, ভেতরে আসা যাওয়ার জন্য পথ নির্মাণ করা, হাত-পা ধোঁয়ার জন্য পানির ব্যবস্থা করা, পাহারার জন্য লোক নিয়োগ দেওয়া, সংরক্ষণের জন্য দেওয়ালের বেষ্টনী দেওয়া, পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী ক্রয় ও তা ব্যবহারের জন্য লোক নিযোগ দেওয়া ইত্যাদি। উক্ত খাতগুলোতে ব্যয় করা যাবে। একইভাবে কবরকে চিহ্নিত করে রাখতে ফলক স্থাপন করা, কবরকে সমতল থেকে কিছু উঁচু করা, হেফাজতের জন্য বেষ্টনী দেওয়া ইত্যাদি কাজের জন্যও খরচ করা যাবে। খরচের জন্য সরকারি-বেসকারি অনুদান, যাদের কবর তারা নিজেরা খনন, ফলক স্থাপন ইত্যাদিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় বহন করবেন। কবরস্থানের নামে কোনো সম্পদ থাকলে তা থেকে আয় হতে পারে। যেমন দোকান, আবাদের জমি ইত্যাদি। সেগুলো ভাড়া দিয়ে বা আবাদ করে যা আয় হবে, তা দিয়ে কবরস্থানের ব্যয় নির্বাহ করা হবে। আয়ের জন্য বৈধ অন্য কোনো মাধ্যমও হতে পারে।

 

কবরস্থানে যেসব ব্যয় বৈধ নয়

কবরের জন্য অতিরঞ্জিত কোনো ব্যয় করা বৈধ নয়। যেমন কবরকে সমতল ভূমি থেকে অত্যধিক উঁচু করা। (মুসলিম : ৯৬৯); কবর পাকা করা বা তার ওপর সৌধ, স্তম্ভ, ছাদ, গম্বুজ, মিনারা ইত্যাদিসহ সৌন্দর্যবর্ধনে যেকোনো নির্মাণ করা (মুসলিম : ৯৭০); কবরস্থানে আলোকসজ্জা করা। (প্রাগুক্ত)।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা, ইমাম ও খতিব, বাইতুস সালাম জামে মসজিদ, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *