ওয়াকফ কী ও কেন

ওয়াকফ কী ও কেন

মুফতি লুকমান হাসান

মুহাদ্দিস, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা; ইমাম ও খতিব, বাইতুস সালাম জামে মসজিদ, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা

ওয়াকফের পরিচয়

বিশিষ্ট আরবি ভাষাবিদ আল্লামা ফীরুজাবাদি (রহ.) লিখেছেন ‘ওয়াকফ অর্থ মুক্ত রাখা, আবদ্ধ রাখা।’ (আল কামুসুল মুহিত : ৩/২৯৬)। প্রচলিত ওয়াকফকে এ কারণে ‘ওয়াকফ’ বলা হয় যে, ওয়াকফকৃত সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়সহ মালিকানাসূলভ সব আচরণ থেকে মুক্ত রাখা হয় এবং সংরক্ষণ করা হয়। ইমাম ইবনে কুদামা (রহ.) এর পারিভাষিক অর্থ লিখতে গিয়ে বলেন, ‘কোনো বস্তুর এভাবে দান করা যে, এর মূল সব সময় বহাল থাকবে। তবে এর উপযোগ ও উপকারিতা আল্লাহর পথে ব্যয় হবে।’ (আল মুগনি : ৮/১৮)। অর্থাৎ কোনো বস্তু থেকে ব্যক্তির মালিকানা তুলে নিয়ে তা আল্লাহতায়ালার মালিকানায় সোপর্দ করা এবং এর উপকার ও উপযোগ আল্লাহর বান্দাদের কাছে পৌঁছানোকে ওয়াকফ বলে। দান বা ওয়াকফ বোঝায়- এমন শব্দের মাধ্যমে স্বীয় ইচ্ছা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার দ্বারা ওয়াকফ সংঘটিত হয়। (আল বাহরুর রায়েক : ৫/১৯০)। ওয়াকফ লিখিতভাবে করা যেতে পারে, আবার মৌখিকভাবেও করা যেতে পারে। তবে সাধারণত লিখিত দলিল সম্পাদন করা হয় এবং এটিই উত্তম।

 

ওয়াকফ কেন?

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা কিছুতেই পুণ্যের নাগাল পাবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু হতে (আল্লাহর জন্য) ব্যয় করবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ৯২)। এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা প্রিয় বস্তু ব্যয় করতে বলেছেন। ওয়াকফ আল্লাহতায়ালার রাস্তায় ব্যয়ের অন্যতম একটি মাধ্যম। কেন না, ওয়াকফের মধ্যে মানুষের প্রিয় জিনিস আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হয়ে থাকে। এছাড়া আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবিরা ওয়াকফ করার মাধ্যমে সর্বপ্রথম প্রিয় জিনিস ব্যয় করার আমল শুরু করেছেন। আনাস (রা.) বলেন, আয়াতটি নাজিল হওয়ার পর আবু তালহা (রা.) বললেন, ‘আমাদের রব আমাদের প্রিয় সম্পদ ব্যয় করতে বলেছেন। হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আপনি সাক্ষী থাকুন, আমি আমার প্রিয় জমি আল্লাহর জন্য (ওয়াকফ করে) দিলাম।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘এটিকে তোমার আত্মীয় উবাই ইবনে কাব ও হাসসান ইবনে সাবেতের জন্য (ওয়াকফ) করো।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ৪/১৩২)।

 

ওয়াকফ সম্পর্কিত নীতিমালা

আন্তর্জাতিক শরিয়া স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়নকারী একটি প্রতিষ্ঠান হলো,

অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস (অ্যাওফি)। প্রতিষ্ঠানটির মূল কার্যালয় বাহরাইনে অবস্থিত। বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ইসলামি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তাদের শরিয়া স্ট্যান্ডার্ডকে অনুসরণ করে থাকে। আল মাআয়িরুশ শারইয়্যাহ নামে এ পর্যন্ত ৬১টি শরিয়া স্ট্যান্ডার্ড তারা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ৩৩তম স্ট্যান্ডার্ডটি হলো ওয়াকফ সম্পর্কে। এতে ওয়াকফের নীতিমালা ও আধুনিক প্রয়োগের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারাভিত্তিক সুবিন্যস্ত আলোচনা স্থান পেয়েছে। মৌলিকভাবে ওই স্ট্যান্ডার্ডের পাশাপাশি অন্যান্য আরও কিছু গ্রন্থের সহায়তায় সামনের বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো

১. ওয়াকফের আইনি ভিত্তি : শরিয়ার দৃষ্টিতে ওয়াকফের নিজস্ব লিগ্যাল এনটিটি বা আইনি সত্তা রয়েছে, যার ভিত্তিতে ওয়াকফ নিজে দায়গ্রস্ত হয় এবং অন্যের ওপরও তার দায় সৃষ্টি হয়। ওয়াকফের মোতাওয়াল্লি বা কমিটি কেবলই তার প্রতিনিধি বা পরিচালক মাত্র।

২. ওয়াকিফ বা দাতা : ওয়াকিফ বলা হয় ওয়াকফকারী ব্যক্তিকে। দাতা প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন হতে হবে এবং তার মধ্যে সম্পদে হস্তক্ষেপ করার যোগ্যতা থাকতে হবে। দাতা যেমন ব্যক্তি হতে পারেন, তেমনি কোনো আইনগত প্রতিষ্ঠানও ওয়াকফকারী হতে পারেন। আইনগত সত্তার ওয়াকফ সঠিক হওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের সাধারণ পরিষদ (জিসি) সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

৩. মাওকুফ বা ওয়াকফ প্রপার্টি : যে সম্পদ ওয়াকফ করা হয়ে থাকে, তাকে মাওকুফ বা ওয়াকফ প্রপার্টি বলা হয়। তা স্থাবর, অস্থাবর এমনকি ক্যাশও হতে পারে। যেমন ঘোড়া, অস্ত্র, গাড়ি ইত্যাদি। আর ক্যাশ ওয়াকফ করা হলে তা সুরক্ষিত পন্থায় বিনিয়োগ করবে এবং তার প্রবৃদ্ধি দ্বারা সেবা করবে। অনুরূপ হালাল শেয়ার, ইনভেস্টম্যান্ট সুকুক ইত্যাদিও ওয়াকফ করা যায়। মাউকুফের ক্ষেত্রে আবশ্যক হলো, তা শরিয়া কর্তৃক স্বীকৃত সম্পদ হতে হবে। তাতে ওয়াকিফের পূর্ণ মালিকানা স্বত্ব থাকতে হবে এবং ওয়াকফ করার সময় তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। অনুরূপ মাওকুফ বস্তুটি কল্যাণকর হওয়া আবশ্যক। যেমন মসজিদ নির্মাণ, গরিবদের উপকার ইত্যাদি।

৪. মাওকুফ আলাইহি বা বেনিফিসিয়ারি : মাওকুফ আলাইহি হলো, ওয়াকফের উপযোগ ও উপকারভোগী পক্ষ। যাদের উদ্দেশ্যে ওয়াকিফ ওয়াকফ করেছেন। বেনিফিসিয়ারি মুসলিম হওয়া জরুরি নয়; বরং অমুসলিম ও বিত্তশালীরাও বেনিফিসিয়ারি হতে পারে। এমনকি পশু-পাখি সংরক্ষণ, সেবা, পরিচর্যা ইত্যাদির উদ্দেশ্যেও ওয়াকফ হতে পারে। সাধারণ দানের চেয়ে ওয়াকফের ভিন্নতা ও অনন্যতার বড় একটি দিক এটি। ইতিহাসের পাতায় মুসলমানদের সেবামূলক কার্যক্রমের যে সোনালি অতীত পাওয়া যায়, তার পেছনে তাদের বহুমাত্রিক খাতে ওয়াকফ ব্যবস্থার সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে গবেষকরা মনে করেন। যেমনÑ উসমানি সাম্রাজ্য ছিল উৎপাদন ও ফসলনির্ভর। তারা রাষ্ট্রের ২০ শতাংশ ফসলি জমি শুধু ওয়াকফের প্রবৃদ্ধির খাতে ব্যবহার করত। তাই অনেক গবেষক এমন দাবি করেছেন যে, উসমানি সাম্রাজ্য ইসলামি শাসন ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে এত দীর্ঘ সময় ইউরোপের বুকে বসে স্বার্থক শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকার পেছনে সততাপূর্ণ সুচারু ওয়াকফ ব্যবস্থাই মৌলিকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। উসমানি সাম্রাজ্যে ওয়াকফের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী তখন যেসব খাতে ওয়াকফ ব্যবস্থা ছিল, তার কয়েকটি শিরোনাম হলো ১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২. কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ৩. বিধবা ও এতিমদের কর্মসংস্থান, ৪. বৃদ্ধাশ্রম, ৫. দুস্থ ও ঋণগ্রস্থদের সহায়তা প্রতিষ্ঠান, ৬. দুগ্ধপোষ্য শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, ৭. বিবাহ উপযুক্ত মেয়েদের উপযুক্ত পাত্রস্থকরণ ও আয়োজন ব্যবস্থাপনা সংস্থা, ৮. বিবাহ উপযুক্ত অভাবী যুবকদের অর্থায়ন ও অনুদান কেন্দ্র, ৯. হজ্বযাত্রী ও মুসাফিরদের সহায়তা কেন্দ্র, ১০. বেকারদের কর্মসংস্থান কেন্দ্র, ১১. খাল খনন, ১২. পুল নির্মাণ, ১৩. ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, ১৪. মুসাফিরখানা নির্মাণ, ১৫. গণশৌচাগার নির্মাণ, ১৬. পথঘাট নির্মাণ ও পুননির্মাণ, ১৭. কূপ খনন, ১৮. গরিব, দুস্থ, অসহায়, অভাবী ও মুসাফিরদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ সংস্থা, ১৯. পশু-পাখি পরিচর্যা বিভাগ, ২০. ক্লিনিক, হাসপাতাল ও মেডিকেল হাসপাতাল, ২১. লাইব্রেরি ও পাঠাগার ইত্যাদি। (প্রাগুক্ত)।

৫. ওয়াকফকারীর শর্ত : ওয়াকফের উদ্দেশ্য ও শরিয়ানীতির বিরোধী নয় এমন যে কোনো শর্ত যুক্ত করে ওয়াকিফ তার ওয়াকফ করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ওই শর্ত বাস্তবায়ন ও রক্ষা করা মোতাওয়াল্লি ও প্রশাসনের ওপর শরিয়ার দৃষ্টিতে একটি আবশ্যকীয় করণীয় হয়ে যায়।

৬. ওয়াকফের প্রকার : মাওকুফ আলাইহি বা বেনিফিসিয়ারির দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াকফের চারটি প্রকার রয়েছে। যথা (ক) ওয়াকফ আহলি বা ফ্যামেলি ওয়াকফ। অর্থাৎ যে ওয়াকফের উপযোগকে ওয়াকিফ তার নিজের জন্য কিংবা তার সন্তান-সন্তুতি অথবা সুনির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা সাময়িকভাবে নির্দিষ্ট কোনো খাতের জন্য ওয়াকফ করে থাকে। (খ) ওয়াকফ খাইরি বা চ্যারিটি ওয়াকফ। অর্থাৎ কোনো গোষ্ঠী বা পরিবারকে নির্দিষ্ট না করে ব্যাপকভাবে কল্যাণমূলক যে কোনো খাতে ওয়াকফ করা। (গ.) ওয়াকফ মুশতারাক বা জয়েন্ট ওয়াকফ। উপরিউক্ত উভয় প্রকার একসঙ্গে নিয়ত করে ওয়াকফ করাকে জয়েন্ট ওয়াকফ বলা হয়। (ঘ) ওয়াকফ আলান নাফস বা সেলফ ডেডিকেটেড ওয়াকফ। অর্থাৎ শুধু নিজের জন্য ওয়াকফ করা। এ ক্ষেত্রে দাতার মৃত্যুর পর তার বয়ান মোতাবেক কোনো কল্যাণমূলক খাতে তা ব্যবহার হবে। (অ্যাওফি : শরিয়া স্ট্যান্ডাড নং ৩৩)। এর আগে বলা হয়েছে, ওয়াকফ শরিয়াহর দৃষ্টিতে একটি দান বা সদকা। তবে এটি অন্যান্য সদকার চেয়ে বিভিন্ন দিক থেকে স্বতন্ত্র ও অনন্য। কিছু পার্থক্য এখানে উল্লেখ করা হলো।

 

ওয়াকফ ও সাধারণ দানের মধ্যে পার্থক্য

ওয়াকফ একটি বিশেষ দান। সাধারণ দানের চেয়ে এর ভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন ওয়াকফে মূল অক্ষুণ্ণ রেখে শুধু বস্তুর উপকারিতা দান করা হয়, কিন্তু অন্যান্য দানে মূলও দান করে দিতে হয়। ওয়াকফের উপযোগ ও উপকারিতা চলমান ও অব্যাহত থাকে, পক্ষান্তরে সাধারণ দান সাময়িক ও অস্থায়ী উপকার করে। ওয়াকফ খাতের পরিধি সাধারণ দানের চেয়ে অনেক বিস্তৃত, আর্থসামাজিক উন্নয়নে ওয়াকফের প্রভাব সুদূর প্রসারী; কিন্তু সাধারণ দানের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। তাই সাধারণ দানের পাশাপাশি ওয়াকফ করার ব্যাপারেও আগ্রহ থাকা কাম্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *