ই-কমার্স খাতে অস্থিরতা প্রয়োজন শরিয়াহ সমন্বয় ও সচেতনতা

ই-কমার্স খাতে অস্থিরতা প্রয়োজন শরিয়াহ সমন্বয় ও সচেতনতা

আবু সাঈদ যোবায়ের

বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে সৃষ্ট অস্থিরতা সবারই দৃষ্টি কেড়েছে । সাধারণ মানুষের কষ্ট উপার্জিত  অর্থের বিরাট একটি অংশ আবার  বেহাত হয়েছে। ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপেটু সহ বহু প্রতিষ্ঠান এভাবেই মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়ে  ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে। আসলে সময়ের পরিবর্তনে প্রতারণার ধরনে পরিবর্তন এসেছে, তবে মূল বিষয় বা প্রতারণা ঠিক ভাবেই চলছে। আগের প্রতারণা গুলো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ছিল,  এবারের গুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে হয়েছে,  এই যা।

 

 খুব সহজভাবে যদি বলি, ই-কমার্স অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠেছিল বিভিন্ন চটকদার লোভনীয় অফার এর কারণে। সামগ্রিকভাবে আমাদের সমাজে সচেতনতা, শিক্ষা ও নজরদারির অভাবের কারণে বেশ বড় মাশুল দিতে হয়েছে। অবশ্য,  এসব লেনদেনের মাঝে শরিয়া দৃষ্টিতে বেশ কিছু সমস্যা ছিল। শরিয়াহ সচেতন লোকজন তাই এসব এড়িয়ে চলছিলেন। মোটা দাগের কয়েকটি শরিয়াহ লংঘন ও সচেতনতা নিয়ে আমরা কথা বলবো, ইনশাআল্লাহ। 

 

শরিয়াহ লংঘন 

একটি আলোচিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করতো।  তবে তারা আগাম পেমেন্ট নিয়ে নিত। পণ্য ডেলিভারির সময় তারা গ্রাহককে জানাত যে তারা পণ্যটি দিতে পারছেন না।  গ্রাহককে বাজারমূল্য অনুযায়ী চেক প্রদান করার কথা বলা হত। এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়,  বরং গ্রাহকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের অভিজ্ঞতা এমনই। বরং অনেকে কম টাকা পরিশোধ করে বেশি টাকার চেক পাওয়ার আশায় থাকতেন। শরিয়াহ বিশেষজ্ঞগণ এসব লেনদেন নিয়ে বিস্তর কথা বলেছেন। এভাবে কম টাকা দিয়ে বেশি টাকা নেয়ার লেনদেনকে নাজায়েজ বলেছেন। শুধু এই একটি লেনদেন যদি শরিয়ার কথা বলে বন্ধ করে দেয়া যেত,  তাহলে অন্তত কিছু মানুষের লেনদেন এখানে কম হতো। এবং সবশেষে কিছু মানুষের টাকা খোয়া যাওয়া থেকে বেঁচে যেত। লাভটা দিনশেষে মানুষের এবং অর্থনীতির ই হত।

এর সমাধানে আমরা বলতে চাই, ‘দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম।  এদের মাঝে দ্বীন ও ইসলাম মেনে চলতে আগ্রহীদের সংখ্যাও প্রচুর। এহেন মুহূর্তে আমরা মনে করি, দেশে জাতীয় শরীয়াহ বোর্ড থাকা প্রয়োজন। যেকোনও ব্যবাসায়িক মডেল বাজারে প্রচারের পূর্বে  এর শরীয়াহ অনুমোদন নেয়া প্রয়োজন। এতে  জনগণ শুরুতেই শরীয়াহ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠতে পারবে। তথাকথিত এমএলএম, ই-ভ্যালীর মতো ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষের প্রতারিত হওয়ার হারও কমে যাবে।

 

সচেতনতার অভাব 

৫০%, ১০০%, এমনকি ১৫০% পর্যন্ত যেসব অফার দেয়া হতো,  সচেতন মানুষ খুব সহজেই এর ভবিষ্যৎ  দেখে নিতে পারতেন। আমাদের নানাভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে এত অফার দিলেও কোনো অসুবিধা নেই। আমরাও সেসব কথা বিশ্বাস করে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিনিয়োগ করেছি।   কিন্তু, আমাদের সামগ্রিক স্বল্প সচেতনতার মাশুল আমরা আবারও দিয়েছি। 

 

 

নজরদারির অভাব 

যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারীর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রকৃত নজরদারির অভাব আমরা বরাবরই অনুভব করেছি।  এবং বিভিন্নভাবে এর মাশুল দিয়ে যাচ্ছি।  ই-কমার্স খাতে সৃষ্ট অস্থিরতা একটি বড় উদাহরণ।যারা দেশ ও জাতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, তাদের খেদমতে ছোট্ট একটি হাদিস আরজ করব, 

 

عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما، أنه: سمع رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: «كلكم راع ومسئول عن رعيته، فالإمام راع وهو مسئول عن رعيته، والرجل في أهله راع وهو مسئول عن رعيته، والمرأة في بيت زوجها راعية وهي مسئولة عن رعيتها، والخادم في مال سيده راع وهو مسئول عن رعيته»،.  البخاري: 2409. 

“হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত,  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল,  দায়িত্বের বিষয়ে তোমাদের কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক একজন দায়িত্বশীল, একজন পুরুষ তার পরিবারের বিষয়ে দায়িত্বশীল, একজন নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানের বিষয়ে দায়িত্বশীল, একজন গোলাম তার মনিবের সম্পদের বিষয়ে দায়িত্বশীল এবং তাকে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (বুখারী : 2409

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্বের বিষয়ে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার তাওফীক দান করুন।  

 

লোভ

লোভাতুর পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার আমাদের বসবাস। আমাদের সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা সবকিছুতেই পুঁজিবাদী চরিত্রের আধিপত্য।  অর্থ বিত্তের উচ্চাভিলাষ নানাভাবে আমাদের শিখিয়ে দেয়া হয়। বস্তুবাদ আমাদের চিন্তার নিত্যসঙ্গী। ফলে আমাদের মাঝে প্রচন্ড লোভী একটি চরিত্র খুব সহজেই গড়ে ওঠে। পরকাল বিমুখতা সামাজিক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে । ঠিক এভাবেই বেসামাল লোভ নিয়ে আমাদের অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। 

দিন ও তাকওয়ার চর্চার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। কারণ দিন মানুষের আত্মিক উন্নয়ন ঘটায়। আর বস্তুবাদ ও পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা নানাভাবে আমাদের ভোগায়। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার শিকল ভাঙতে পারলেই এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি সম্ভব। হয়তো আবারও আমরা জেগে উঠবো।  এমনটিই প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *