ইসলামী বীমা (তাকাফুল): প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণ

ইসলামী বীমা (তাকাফুল): প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণ

লুকমান হাসান (মুফতি; সি এস এ এ, এ্যাওফি)

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

ইসলামি অর্থনীতির অন্যান্য ইন্ডাষ্ট্রির মতো তাকাফুল ইন্ডাষ্ট্রিও বিশ্ব বাজারে সমাদৃত হচ্ছে দিন দিন। আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরী করে থাকে ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বোর্ড (আই এফ এস বি)। আইএফএসবির ২০২০ এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমান (২০১৯) সময়ে ইসলামী ফিন্যান্স সার্ভিসেস ইনস্টিটিউশনসের প্রধান তিনটি বিভাগের (ব্যাংক, ক্যাপিটাল মার্কেট ও তাকাফুল) মোট সম্পদ প্রায় ২ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এর মধ্যে তাকাফুল কনট্রিবিউশনসের পরিমাণ (২০১৮ শেষে) ২৭ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক ইসলামিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট অ্যাসেটের ১ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে তাকাফুল তথা ইসলামী বীমার প্রবৃদ্ধির হার

গত ২০১১-১৮ পর্যন্ত ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমান বিশ্বের ৩৩টি দেশে তাকাফুল কোম্পানির সংখ্যা পূর্ণ ও

উইনসহ মোট ৩৫৩টি। 

বাংলাদেশে ১৯৯৯ সাল থেকে প্রথমবার ইসলামী বীমার কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশে পূর্ণ ও উইন্ডোসহ মোট বীমা কোম্পানির সংখ্যা ৭৬। তার মধ্যে ইসলামী বীমার সংখ্যা ২৬টি। তিনটি নন-লাইফ পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বীমা কোম্পানি, আটটি লাইফ পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বীমা কোম্পানি ও ১৫টি লাইফ ইসলামী বীমা উইং ইসলামী বীমা ব্যবসা পরিচালনা করছে। দিন দিন সংখ্যার বিচারে ইসলামী বীমা শিল্প বাংলাদেশে বেশ অগ্রসর। অল্প সময়ে তাকাফুলের এই অগ্রযাত্রা উৎসাহব্যঞ্জক।

ইসলামী তথা তাকাফুল বীমায় ২০১৮ সালে প্রিমিয়াম সংগ্রহের পরিমাণ ১ হাজার ৫২ কোটি ২ লাখ টাকা, যা বছরটিতে সংগৃহীত মোট প্রিমিয়ামের ১২ শতাংশ। এর আগে ২০১৭ সালে তাকাফুল বীমায় মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল ৯৪৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা বছরটিতে সংগৃহীত মোট প্রিমিয়ামের ১২ শতাংশ ছিল। তুলনামূলকভাবে ২০১৮ সালে তাকাফুল বীমার প্রিমিয়াম আয়ে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে (ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি, ১৮/১০/২০১৯)

বীমা কোম্পানীগুলো ইসলামী বীমায় রূপান্তরিত হওয়ার প্রবণতাও বর্তমানে চোখে পড়ার মতো। কোভিড-১৯ এ বীমা অন্যান্য আর্থিক খাতের মতো বীমা খাতও প্রভাবিত হয়েছ। তবু নতুন করে ইসলামী বীমা পরিচালনা লাইসেন্স পেয়েছে কয়েকটি প্র্রতিষ্ঠান। সবমিলিয়ে সংখ্যার বিচারে ইসলামী বীমার এই অগ্রগতি আশা জাগানিয়া। অপরদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মতো তাকাফুল ব্যবস্থারও গ্রোথ হচ্ছে। গবেষকরা মনে করেন, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা যেভাবে তার আবেদন হারাচ্ছে, তাতে নতুন অর্থ ব্যবস্থার উদ্ভব অবসম্ভাবী। আর পরবর্তী অর্থনীতির সে জায়গাটা ইসলামী অর্থনীতি দখল করবে। ইসলামী অর্থনীতির বিশ্বব্যাপী অগ্রগতির সূচক উর্ধমুখী হওয়া তার প্রমাণ।

আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরী করে থাকে ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বোর্ড (আই এফ এস বি)। ইতিমধ্যে ২০২১ঈ. এর রিপোর্ট তারা প্রকাশ করেছে। তাতে আন্তর্জাতিক তাকাফুল ব্যবস্থার প্রতিবেদনও স্থান পেয়েছে। 

উক্ত প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক ইসলামিক ব্যাংকিং মার্কেট, ইকুয়িটি মার্কেট এবং তাকাফুল মার্কেট সম্পর্কে রিপোর্ট করা হয়েছে। তাকাফুল মার্কেট ফিগার সম্পর্কে বলা হয়ছে, সামগ্রিকভাবে ২০১৯ সালে তাকাফুল কন্ট্রিবিউশন ছিলো প্রাই ২৩.১ বিলিয়ন। কভিড-১৯ এর কারণে অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতের মতো তাকাফুল ইন্ডাষ্ট্রিও প্রভাবিত হয়েছে।

তাকাফুলের সবচেয়ে বড় মার্কেট ফিগার হলো সৌদি আরব এবং তারপর রয়েছে ইরান এবং তৃতীয়তে রয়েছে মালয়েশিয়া। যেহেতু এগুলো ইসলামী রাষ্ট্র, তাই তারা তাকাফুল কনট্রিবিউশনে শীর্ষস্থান দখল করেছে। 

উক্ত ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের নামও স্থান পেয়েছে। পাকিস্তান, বাহরাইন ও মিসরের পরের অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৯ এর ডাটাবেজ অনুসারে বাংলাদেশের তাকাফুল কনট্রিবিউশনস পরিমাণ ২০৮.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও উক্ত রিপোর্টে বলা হয়ে যে, বাংলাদেশের তাকাফুল ইন্ডাষ্ট্রির কনট্রিবিউশন সম্পর্কে স্বতন্ত্র কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সামগ্রিক বীমা প্রিমিয়ামে তাকাফুল কনট্রিবিউশন নির্ণয় করতে বিভিন্ন পরিসংখ্যানের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে বীমা বাজারে ইসলামী বীমার অবস্থান ১৪.১% বলা হয়েছে। অর্থাৎ বীমা ইন্ডাষ্ট্রির শত করা ১৪.১ প্রতিষ্ঠান ইসলামী বীমা। 

বাংলাদেশের তাকাফুল ইন্ডাষ্ট্রির ডাটা অস্পূর্ণ বলে উক্ত রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ২০১৯ এর সার্বিক প্রিমিয়ামের তথ্য পাওয়া গেলেও সকল তাকাফুল অপারেটরের কনট্রিবিউশনস সম্পর্কে পূর্নাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় নি। তবে মার্কেটে ফ্যামিলি তাকাফুলের প্রাধান্য রয়েছে। যা ২০১৮ সনে সার্বিক প্রিমিয়ামের ৯৩% ছিলো। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায়, ২০১৯ সালেও উক্ত হার বহাল আছে।

অবশ্য রেগুলেটরি বডির দিক থেকে বাংলাদেশের ইসলামী অর্থনীতির মার্কেট প্রশংসনীয় ও আশানুরূপ হিসাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। তার কারণ, নতুন নতুন ইসলামী বীমা কোম্পানির অনুমোদন, সুকুক ইস্যুকরণ সহ ইসলামী অর্থনীতির নতুন নতুন মার্কেট তৈরীতে সরকারের অংশগ্রহণ অত্যন্ত আশা জাগানিয়া ও অভিবাদনযোগ্যও বটে।

তবে বাংলাদেশের ইসলামী অর্থনৈতিক খাতে শরীয়াহ কম্প্লাইন্স নিয়ে বরাবরের মতো আপত্তি থেকেই গেছে। বিশেষত ইসলামী বীমা খাতের দিকে আপত্তির অঙ্গুলি তোলা হয়েছে। তাছাড়া ইসলামী বীমা আইন, রেগুলটরি আইন ও স্বক্রিয় শরীয়াহ কমিটিরও অপর্যাপ্ততার অভিযোগও কম নয়। তাই এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সবিশেষ দৃষ্টি দিবেন বলে আমরা আশাবাদি। আল্লাহ সুবহানাহু তাওফিক দিন এবং কবুল করুন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *