অর্থনৈতিক বৈষম্য কারণ ও প্রতিকার

মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম

চলমান অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির পেছনে অর্থনীতিবিদরা নানা কারণ চিহ্নিত করেছেন। বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেসব কারণের কথা বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন, তা হলো

দুর্নীতি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দুর্নীতি একটি সহজ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনও দুর্নীতিতে বাংলাদেশ ১২তম অবস্থানে আছে। বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক পরিচালিত ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২০-এর তথ্যানুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকায় নিচের দিক থেকে বাংলাদেশ ১২তম অবস্থানে আছে। যেটা সিপিআই ২০১৯-এর তুলনায় দুই ধাপ নিচে নেমেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১৯ সালে নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪তম। অর্থাৎ দুর্নীতি দমনে দুই ধাপ খারাপ করেছে বাংলাদেশ। গত কোভিড ১৯ কালে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ছিল বেশ উল্লেখযোগ্য। নানা দুর্নীতির মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য।

মাসেল পাওয়ার

বৈষম্যের আরেক কারণ মাসেল পাওয়ার বা জোর-দখল। ক্ষমতা ও অর্থের জোর আছে যার, সে অন্যের সম্পদ দখল করে নিচ্ছে। আধুনিক ভূমিদস্যু ব্যবসা এর অন্যতম। এর মধ্যে বনের জমি দখল করে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার হার চোখে পড়ার মতো। বন অধিদপ্তরের করা এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বনের জমি দখল করে ২৯৯ ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এ ক্ষেত্রে দখলের পরিমাণ ১ হাজার ৭২১ দশমিক ৮৯ একর জমি। এ ছাড়া সাধারণ দখলদার আছে ৫ হাজার ৫৫৬ জন। (সূত্র : দৈনিক বণিক বার্তা, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১)।

বিত্তবানবান্ধব আইন প্রণয়ন

গত ১০-১২ বছর যাবৎ দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত যেভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, ব্যাংক, কর ও ব্যবসানীতি ইত্যাদি নীতি প্রণয়নে পুঁজিপতি বিত্তবানদের স্বার্থ অধিক প্রাধান্য পাচ্ছে। চলতি অর্থ বছর (২০২১-২০২২)-এর বাজেট বক্তব্যে মাননীয় অর্থমন্ত্রী তো স্পষ্টই বলেছেন, ‘এ বাজেট ব্যবসায়ীবান্ধব।’ সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক আইন করেছিল, চলতি বছর (২০২১)-এর ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি গ্রাহকরা যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করার কথা, তার ২৫ শতাংশ দিলে সে আর খেলাপি বলে গণ্য হবে না। কিন্তু বিত্তবান ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে পড়ে মাননীয় গভর্নর এ নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের দাবির মুখে ২৫ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে আসা হয়েছে। আইন পাস হওয়ার মাত্র ১০ থেকে ১১ দিনের মধ্যেই পুনরায় আইন পরিবর্তন করতে হয়েছে। এ ধরনের নজির বিশ্বের কোথাও নেই। এভাবে বিত্তবানবান্ধব নীতি ও আইন প্রণয়নে দিন শেষে জাতীয় আর্থিক বৈষম্যই শুধু তৈরি হচ্ছে।

সুদ

অর্থনীতিতে সুদ একটি অনুৎপাদনশীল খাত হিসেবে পরিচিত। একদিকে সম্পদ প্রাপ্তি নিশ্চিত করলেও দাতার দিক থেকে সম্পদ প্রাপ্তি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত থেকে যায়। গ্রামীণ সমাজে সুদি এনজিও, সমিতির মাধ্যমে যেভাবে সুদের ভয়াবহ জাল ছড়িয়ে পড়েছে, এতে বহু বনি আদমের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক জীবন বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় আটকে গেছে। জানা গেছে, এসব ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণকারী সংস্থাগুলো প্রতি মাসে শতকরা ১০ ভাগ সুদ নিয়ে থাকে। এর অর্থ হচ্ছে, বছরে সুদ দিতে হবে ১২০ শতাংশ। কেউ যদি ১০ হাজার টাকা ঋণ নেয়, তাকে এক বছর পর আসল ১০ হাজার টাকা এবং অতিরিক্ত ১২ হাজার টাকা সুদ দিতে হবে। অর্থাৎ মোট ২২ হাজার টাকা শোধ করতে হবে। এ হিসেবে ১ লাখ টাকা নিলে বছর শেষে ১২০ হাজার টাকা সুদসহ মোট ২২০ হাজার টাকা দিতে হবে। এভাবে ঋণগ্রহীতাদের অর্থনৈতিক জীবন এক অনিশ্চয়তায় আটকে যায়। বাহ্যত হয়তো সে প্রাপ্ত ঋণের টাকায় কিছু সামগ্রীর মালিক হয়ে যায়, হয়তো একটি সেলাই মেশিন কিনতে পেরেছে বা জেলে একটি জাল কিনেছে; কিন্তু এর অভ্যন্তরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কয়েকগুণ অধিক সুদ পরিশোধ করতে হয়। একসময় এ দায় পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে ঘরবাড়ি রেখে পলায়ন করে, কখনও আত্মহত্যাও করে। পত্রপত্রিকায় এমন সংবাদ প্রায়ই আসে। ব্যাংক পর্যায়ে যারা সুদি ঋণ বিতরণ করে, সেখানেও এর দায় শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ জনগণের ওপর। এভাবে সুদ অর্থনীতিতে জাতীয় বৈষম্য তৈরিতে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

বৈষম্য প্রতিরোধে করণীয়

অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রতিরোধে আমাদের সম্পদের রি-ডিস্ট্রিবিউশন বা পুনবণ্টনের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। সম্পদ যেন কারও কাছে কৃত্রিমভাবে কুক্ষিগত না হয়ে যায়, সে লক্ষ্যে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে

১. তাকওয়া বা আল্লাহভীরুতার শিক্ষা বিস্তার করা। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সম্পদে বৈষম্য সৃষ্টির পেছনে সম্পদের প্রতি অতি মাত্রায় লোভ-লালসা কাজ করে। সেখান থেকে দুর্নীতির মানসিকতা তৈরি হয়। তাই স্কুল-কলেজে সর্বত্র তাকওয়ার চর্চা হওয়া দরকার। আল্লাহভীতি সৃষ্টি না হলে কোনো আইনই মূলত মানুষকে রাতের অন্ধকারে দুর্নীতি করা থেকে বিরত রাখতে পারবে না।

২. সম্পদ ও আয়ের পুনর্বণ্টনের পথ গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য ইসলামের জাকাত বিধানকে জাতীয়ভাবে বাস্তবায়ন করা চাই। সামাজিক করজে হাসানা ও ওয়াকফকে গণমুখী করা দরকার। পাশ্চাত্য সভ্যতার আগে পৃথিবীতে এভাবেই সম্পদের বৃহৎ পুনর্বণ্টন হতো।

৩. সুদ, ঝুঁকি গ্রহণমুক্ত মুনাফা, ঋণের বিক্রয় ইত্যাদি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক লেনদেন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভারসাম্য অর্থব্যবস্থা তথা ইসলামি অর্থব্যবস্থার আলোকে আমাদের সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে হবে।

লেখক : সিএসএএ, অ্যাওফি, বাহরাইন

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আইএফএ কনসালটেন্সি লি.

 

Read in news paper

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *